শ্রীমান কেল্টু কুমারের জীবন পঞ্জিকা।
“আমি শৈশব, কৈশোর, যৌবনকাল অতিবাহিত করে বার্ধক্য কালে পদার্পন করে বানপ্রস্থ জীবনের দিকে রুটমার্চ করে বুক ফুলিয়ে এগিয়ে চলেছি।”
স্বাভাবিক বাধর্ক্যজনিত কারনেই অসুস্থতা এখন নিত্যসঙ্গী।
শৈশবে আমি খুবই শান্তশিষ্ট, লেজবিসিস্ঠ ...........বাবা মায়ের খুবই বাধ্য (পড়বেন অবাধ্য) সন্তান ছিলাম। পড়াশোনায় মোটামুটি। প্রথম শ্রেণী থেকে একাদশ শ্রেণী অবধি মেধার নিরীক্ষে স্থানিয় বিদ্যালয় গুলিতে এক থেকে দুই স্থানের এর মধ্যে বিচরণ করতাম।
বিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রথম দিনের ঘটনা কুয়াশার ধোঁয়ার মতো হাল্কা স্মৃতি হিসাবে এখনও অবধি বর্তমান।
“আমার কাচে ঘসা অস্পষ্ট স্মৃতি শক্তি অনুযায়ী আমি তখন আমাদের এক গ্রাম্য অবৈতনিক প্রাইমারি বিদ্যালয়ের ক্লাস টু কিংবা থ্রি এর ছাত্র, তখন আমি মোটেই শান্ত বালক ছিলাম না।
আমাদের অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পরিবেশ, পৌরাণিক কাহিনীর পাঠশালা ধরনের পরিবেশ ছিল।
একটা একশো ফুট লম্বা টানা ঘর বিশিষ্ট মুলি বাঁশের বেড়া দিয়ে বেস্টিত লম্বা টিনের দোচালা গৃহে প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী অবধি ভাগ ভাগ কে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল।
প্রত্যেক শ্রেণীতে মোটামুটি ২০ থেকে ২৫ জন করে চারটি শ্রেণীতে ঐ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৮০ থেকে ১০০ জন ছাত্র ছাত্রীদের ৪ থেকে ৫ জন মা বাপ খেদানো শিক্ষক বিনা প্রারিশ্রমিকে জ্ঞান দান করে গরীব ছাত্র ছাত্রীদের জীবন গড়ে তোলার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন।
ফলস্বরূপ এক একজন শিক্ষককে বিভিন্ন শ্রেণীতে একের অধিক বিষয়ে শিক্ষকতা করতে হতো।
সেই সময় পুস্তক সমন্বীয় জ্ঞান দান ছাড়া ও ছাত্রদের শারীরিক বিদ্যা মানে বিভিন্ন ধরণের খেলাধুলা (ইনডওর, আউটডোর খেলাধুলা), সাঁতার কাটা, গাছে ওঠা, নাটক, কবিতা পাঠ, গান বাজনা ইত্যাদি বিষয়ে ও শিক্ষকরা সমান ভাবে শিক্ষা দান করতেন ।
শীত বরষায় প্রতিদিনের ক্লাস দুপুর বেলায় ও টিনের চালাঘরে নেওয়া হতো।
আর গ্রীষ্মকালে সকালবেলায় বিদ্যালয় সঃলগ্ন বিভিন্ন ধরনের আম, জাম, পেয়ারা, তেঁতুল বাগানে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া চটের উপর বসে ক্লাসের ব্যবস্থা ছিল।
মৃদু মন্দ বাতাসে ক্লাস চলাকালীন পাকা ফলগুলো টুপটাপ করে আশেপাশের বাগানের গাছ থেকে ঝরে পড়তো।
তখন ক্লাসের পড়াশোনা ছেড়ে সর্বপ্রথম পাকা ফল সংগ্রহ করার প্রতিযোগিতায় আমরা ক্লাসসুদ্ধু দৌড়ে যেতাম এবং ফেরৎ আসার পর ক্লাশের শিক্ষকের কাছ থেকে বিনি পয়সায় নীলডাউন, বেতের মার, কানমোলা ইত্যাদি অধিক উপহার স্বরূপ কপালে জুটতো।
আমার গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একসাথে ছেলে এবং মেয়েদের পড়াশোনা করার ব্যবস্থা ছিল এবং তখন থেকেই একটি সহপাঠিনী কে ভালো লাগতো। সেই বয়সে প্রেম সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না, কিন্তু সহপাঠিনীর সাথে কথা বলার, পাশের সীটে বসার প্রবনতা প্রচুর ছিল।
অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জিনিস পেয়ে আমি এতটাই খুশি হতাম, তাতে আমার হৃদয় আনন্দে ভরে উঠতো।আমার আর অন্য নিজস্ব কোনো রকম চাহিদাই ছিল না।গাছপাকা আম, তেঁতুল, পেয়ারা, কুল পেলে খুশীতে নেচে উঠতাম।
একবার দুর্গাপূজার ছুটির আগের দিন রাস্তার ধারে পাওয়া মেনী বিড়ালছানা পেয়ে এতো ই খুশি হয়েছিলাম যে পুজোর ছুটির পর, স্কুল খোলার দিন আমার ঠাকুরমায়ের হাতে বানানো নারকেল নাড়ু সব বন্ধুদের জন্য ১টা করে, কিন্তু আমার সেই বিশেষ বন্ধুটির জন্য লুকিয়ে ৪টে নাড়ু নিয়ে উপস্থিত হলাম।
টিফিন ব্রেক এ একসাথে খেলাধুলা করার, টিফিন ভাগ করে খাবার, ছুটির পর একসাথে বাড়ীতে ফিরে আসার সময় রাস্তায় গল্প করতে করতে সেই বিশেষ বন্ধুটির সঙ্গ খুবই ভালো লাগতো।
বাৎসরিক পরিক্ষায় তার প্রয়োজনীয় অজানা উত্তরের জন্য আমার উত্তর পত্রের কাগজ কপি করার জন্য তাকে দেওয়ার আমার আগ্রহ খুবই ছিল।
কেন জানিনা সেই বয়সে মাঝে মাঝে সহপাঠীদের টিফিন তাদের অজান্তেই লুকিয়ে নিয়ে অন্যান্য বন্ধুদের সাথে ভাগ করে খাবার আনন্দ খুবই উপভোগ করতাম এবং এই জন্য অবশ্য বাড়ী ফিরে মায়ের হাতের নরম গরম আরংধোলাই মাঝে মাঝে কপালে জুটত।
গ্রাম্য পরিবেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় হওয়ার কারণে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রচুর ফলমূলের বাগান ছিল।ছুটির পর বিদ্যালয় ফেরত পথে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ফলের বাগানের মালিকের অজান্তেই মাঝে মাঝে অভিযানে নেমে পড়তাম।অবশ্যই সেই অভিযানের লীডার হওয়ার বেশি প্রবনতা আমার থাকার কারণে ধরা পড়ে গেলে মায়ের বা বাগানের মালিকের কিংবা শিক্ষকদের প্রদত্ত শাস্তির সিংহভাগ যৌতুক অর্থাৎ কানমোলা বা ওঠবোস, বেত্রাঘাত মত শাস্তি আমার কপালেই বেশি জুটতো।
গ্রাম্য পরিবেশে বিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রচুর পুকুর ও দিঘী ছিল। পুকুর গুলো কচুড়ীপানা ভর্তি ছিল। গ্রাম্য সুবোধ বালক হওয়ার কারণে সাঁতার সমন্ধে জ্ঞান তখন জলভাত ছিল। ছুটির পর বন্ধুদের নিয়ে কচুড়ীপানা দিয়ে ভেলা বানিয়ে নৌকা চড়ার আনন্দ এবং ভেলা নিয়ে দিঘী বা পুকুরের এপার ওপার করার আনন্দই আমাদের প্রাত্যহিক খেলাধুলার অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তখনকার সময়ে ভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে বোর্ডের চতুর্থ শ্রেণির বিত্তি পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। বিত্তি পরীক্ষা দেওয়ার আনন্দই আলাদা ছিল। বাড়ির বাবা কিংবা মায়ের অনুপস্থিতিতে বড় দাদা বা দিদিরা সঙ্গে করে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যেতেন এবং নিয়ে আসতেন। কেননা বাবা তার অফিসের কাজে আসতে পারতেন না,আর মা সংসারের কাজে ও ছোট ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনার জন্য ব্যস্ত থাকতেন। বড় দাদা বা দিদিরা ইচ্ছে না থাকলে ও টিফিন ব্রেক ও ঐকয়েকদিন আমার জন্য কিছু ফলের সাথে দুটো অতিরিক্ত মিস্টি, কচি ডাব শশা দিয়ে আমায় বিশেষ ভাবে তোয়াজ করতেন যাতে পরীক্ষা ভালোভাবে দিতে পারি এবং অবশ্যই আমার অজান্তেই অনিচ্ছাকৃত ভাবে বোধহয় লোভ ও দিতেন।
বিত্তি পরীক্ষার পর আমাকে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশোনার জন্য অন্য স্থানীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়েছিল।
ফলত আমার কৈশোরের সেই প্রেয়সীকে চিরদিনের মতো এই রুক্ষ দুনিয়ায় হারিয়ে ফেললাম। পরবর্তী কালে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আমার সেই নিষ্পাপ প্রেয়সীকে আর খুঁজে পাই নি। তার নাম, তার বাবার নাম, গ্রামের নাম কিছুই এইমুহুর্তে এই বয়সে আমার স্মৃতি কোঠায় তন্ন তন্ন করে খুঁজেও না পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছি। সেই বয়সটা, সেই প্রেয়সী সত্যি সত্যি খুবই সুমধুর ছিল। তাকে হারিয়ে কয়েকদিন খাওয়া দাওয়া, পড়াশোনা,খেলাধুলা কিছুই ভালো লাগতো না।
এখন ঐ সব ব্যপারে ভাবলে খুবই হাসি পায়।
তখন কত সামান্য ব্যপারে আমরা কত আনন্দ ও খুশী হতাম। এক ঝলক দেখা, চার চোখের চোখাচোখি, দুমিনিট কথা বলার, চলতে চলতে অজান্তেই গা এ গা লাগলে শিহরণ অনুভব করা, ভালো, আনন্দতে ও খুশী হতাম।
সেই নিষ্পাপ আনন্দ কিন্তু তারপর এই দীর্ঘ ৬০-৬৫ বছর জীবন কালে কোনো দিনই পাই নি।
ক্লাস ফাইভ, বড় ৩ তলা বিশিষ্ট পাকা দালান বাড়িতে নতুন বিদ্যালয়। পঞ্চম শ্রেণী থেকে এগারো শ্রেণী অবধি কেবলমাত্র প্রায় ১২০০ থেকে ১৪০০ জন ছাত্রদের পড়াশোনার সুবিধাযুক্ত এবং বিভিন্ন বিষয়ের বিভিন্ন শ্রেণী কক্ষের জন্য প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষক, স্টাফ, সহযোগী স্টাফ, ঝাড়ুদার, দারোয়ান ইত্যাদি মিলিয়ে আরো প্রায় ২০ জন যুক্ত এই উচ্চমাধ্যমিকবিদ্যালয় স্থানীয় ভাবে প্রসিদ্ধ ছিল।
আমার পূর্বের অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেরা এক এক জন ২ বা ততোধিক বিষয়ে আমাদের শিক্ষা দান করতেন এবং নিজের আপন সন্তানের মতো পৌরাণের পাঠশালার অনুকরণে নিজেদের হাতে গড়েপিঠে মানুষ করে আমাদের বড় সমুদ্রে সাঁতার কাটার জন্য উপযুক্ত ভাবে তৈয়ারি করে দিয়েছিলেন।
বড় বিদ্যালয়ে প্রথম প্রথম এসে নিজের ক্লাসরুমটাই খুঁজে পেতে খুবই অসুবিধায় পড়তাম। ঐ বিদ্যালয়ের প্রতি তলায় ১৫টি করে ৩ তলায় মোট ৪৫টি ঘর ও ৬ জোরা প্রসাব ও পায়খানা ঘর ছিল।তারমধ্যে ১ টি হেড মাস্টার মশাইয়ের রুম, ৩ টি টিচার্স রুম, ১ টি অফিস রুম, ১ টি স্টাফ রুম, ১টা লাইব্রেরী রুম, ১ টি শিক্ষকদের রিফ্রেসমেন্ট রুম, ২ টি ইনডোর খেলার রুম, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা ও জীবন বিজ্ঞানের লেবোটরি জন্য ১টা করে রুম সঙ্গে দারোয়ানের ও ঝাড়ুদার এবং জমিদারদের ২৪ ঘন্টা থাকার রুম, প্রতি শ্রেনীর জন্য ৩ টি বিভাগের জন্য আলাদা আলাদা করে মোট ২৫ টি ক্লাসরুমের ব্যবস্থা ছিল।
পঞ্চম শ্রেণীর প্রথম ২ মাস নতুন বিদ্যালয়, নতুন বিষয়, নতুন পাঠ্যপুস্তক, নতুন শিক্ষক, নতুন ক্লাসরুম, নতুন বন্ধুবান্ধবদের সাথে পরিচয় পর্ব সারতে সারতে কেটে গেল।
নতুন বিদ্যালয়ে প্রতি বিষয়ে ২ থেকে ৩ জন আলাদা আলাদা শিক্ষক ছিলেন এবং প্রতি শ্রেণীর প্রতি বিভাগে একজন করে ক্লাশ টিচার্স থাকতেন। তিনি বিদ্যালয়ের তরফ থেকে আমাদের অভিভাবক ছিলেন। সুখ দুঃখের, সুবিধা অসুবিধার কথা ওনার কাছে জানানো যেতো।
উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্কুলের প্রতিটি শ্রেণীর পঠন পাঠনের সময় সীমা ছিল সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪.৩০টা অবধি। সকাল ৯টা ৩০ মিনিট এ স্কুলের বড় ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে ফাইনাল ঘন্টার সাথে সাথেই দারোয়ান বিদ্যালয়ের প্রধান গেট বন্ধ করে দিতেন এবং পরবর্তী সময়ে একমাত্র প্রধান শিক্ষকের অনুমতি ভিন্ন সেই প্রধান গেট খোলার পারমিশন ছিল না।
সকাল ১০টা থেকে ১০.১০ মধ্যে বিদ্যালয় সংলগ্ন ময়দানে সমস্ত ছাত্র একসাথে গলা মিলিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "জন গন মন অধিনায়ক জয় হে" গান করে প্রতিদিনের সমবেত প্রার্থনার পর ১০.১৫ থেকে প্রতি শ্রেনীর ক্লাস আরম্ভ হয়ে যেত।
প্রতি ক্লাসের সময়সীমা ৪৫ মিনিট করে টিফিন পিরিয়ডের পূর্বে ৪টি ও পরে ৪টি করে প্রতিদিন ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। মাঝে দুপুর ১.১৫টা থেকে ১.৪৫ অবধি টিফিন ব্রেক থাকতো।
এইভাবে প্রতিবছর গুটি গুটি অর্দ্ধ বার্ষিক এবং বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পঞ্চম শ্রেণী থেকে সপ্তম শ্রেণী অবধি সব বিষয়ে এবং অষ্টম শ্রেণীতে অতিরিক্ত বিষয় সংস্কৃত নিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে আমাদের শিক্ষা জগতের প্রথম গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।
ইতিমধ্যে এই প্রসঙ্গে কিছু কিছু ঘটনা স্মৃতির পরদায় ভেসে ওঠায় আমার প্রিয় পাঠকগনদের পুনরায় তার ব্যক্ত করা প্রয়োজন মনে করি।
সষ্ঠ শ্রেনীতে পড়াশোনার সময় এক অন্তরঙ্গ বন্ধুর বাড়ি থেকে বন্ধুর সাথে যৌথ অভিযানে অংশ গ্রহণ করে তাদেরই বাড়ি থেকে পিঠে চুরি করে অন্য বন্ধুবান্ধবদের সাথে সমবন্টন ভাবে ভাগাভাগি করে খাওয়ার পর ফল স্বরূপ মায়ের হাতের পুনরায় মিষ্টি মধুর অস্টম মধ্যম আড়ংধোলাই প্রাপ্তি জুটেছিল।
কৈশোরে গ্রামে গঞ্জের পরিবেশে নাইটগার্ড দেওয়ার সময় রাত্রিবেলায় অন্ধকারে বন্ধুকে সংগে নিয়ে হঠাত্ ই বন্ধুদের নিজেরই খেজুর গাছের রস চুরি করে খাওয়া ও খেজুরের হাঁড়িতে পুকুরের নোংরা জল ভরে রাখার দুষ্টুমি বুদ্ধি প্রয়োগ, নারকোল, আম, কাঁঠাল গাছে উঠে চুরি করে বন্ধুবান্ধবদের সাথে সমবন্টন ভাবে ভাগাভাগি করে খাওয়া দাওয়ার আনন্দ উপভোগ করতাম।
কোনো এক বর্ষাকালের স্কুল ছুটির দিনে বাবা অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর সকাল বেলায় হঠাত্ ই পড়াশোনা থেকে উঠে দলবল নিয়ে এক বিশেষ বন্ধুকে সংগে নিয়ে তাদের নিজেদের খেজুর গাছ থেকে খেজুর খাওয়ার ইচ্ছে হল। সেই অল্প অল্প বৃষ্টির মধ্যেই ২০ - ২৫ ফুট উচ্চতার খেজুর গাছের মাথায় উঠে পড়লাম।
খেজুর পারার সময়ে খেজুর গাছের মাথা থেকে খেজুর গাছের ডালপালা ভেঙে প্রায় কুড়ি ফুট নীচে গাছের গোড়ার মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যাই, নীচে অপক্ষেমান ডানপিটে সাহসী বন্ধুরা নিমেষেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল।
সেই মুহূর্তে আমাদের পরিবারের সদস্যদের অজ্ঞাতেই অজ্ঞান অবস্থায় সেই বন্ধুরই বাবার কাঁধে চেপে তাদেরই বাড়ি আমাকে নিয়ে গিয়ে জলের ঝাপটা সহযোগে সেবা শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তুললেন।
সেইদিনই বিকেলে আবার আমাদের ক্লাবের ফুটবল টুর্নামেনট ছিল।
বাড়ির সব সদস্যদের অজ্নাতে এবং ক্লাবের মেম্বারদের হতবাক করে ক্লাবের ফুটবল টুর্নামেনটে খেলতে গেলাম, ফলস্বরূপ পরবর্তীকাল সারাদিনের সব ঘটনার প্রবাহ বাড়িতে মায়ের কাছে রিপোর্ট হল ও আমার কপালে মিষ্টি সুমধুর মায়ের আড়ংধোলাই জুটেছিল ।
সেই সময়ে পয়সার অভাবে ক্লাবের হকি খেলার জন্য হকি স্টিক কেনার আমার ক্ষমতা ছিল না। অগত্যা পেয়ারা গাছের ডাল কেটে হকি স্টিক তৈরি করে খেলা হত।
সেই সময়ে এক ডানপিটে বন্ধুর ফ্রিকিক সর্টে হকি স্টিক বলে টার্গেট না করে সরাসরি অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার মুখমণ্ডলিতে আঘাত করে ফ্যর্কচার করে দেয়।
সেই সময়ে বাড়ির সবার অজ্ঞাতেই সেই বন্ধুর বাড়ি গিয়ে র ডেটল ও তুলো দিয়ে ওয়াস করে ডাক্তারিবিদ্যা ফলানো হয়েছিলো।
ফলস্বরূপ মুখমণ্ডলির নরম কোমল চামরা পুড়ে কালো হয়ে যায় এবং সেই স্মৃতিচিন্হ জীবনের অনেক বছর বয়ে বেড়াতে হয়েছিল।
সেই সময়ে প্রায় পনেরো দিন খেলার মাঠের সংগে আমার সব রকম সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন রথের সময় বন্ধু বান্ধবদের সাথে বারুইপুর রথের মেলা দেখতে যাওয়ার প্রোগাম করা হলো। ফেরার সময় রাত্রি দশ ঘটিকায় আমি আমার বন্ধুবান্ধবদের থেকে দলছুট হয়ে ভেড়ার বাচ্চার মতো হারিয়ে গিয়েছিলাম। অগত্যা পকেটে কপর্দকশূন্য অবস্থায় অধিক রাত্রে প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে ও বিনা টিকিটে ট্রেনে করে রাত বারোটায় বাড়ি ফিরে এলাম এবং তদুপরি পরের দিন সকালে অধিক দুই ধামা মায়ের আড়ংধোলাই কপালে জুটেছিল।
এক ই বছর ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়ে পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের সাথে ডায়মন্ডহারবারে বনভোজন করতে যাওয়ার প্রোগাম করা হলো।
পুকুর খাল বিলের সেরা সাঁতারু সমুদ্রে নেমে স্নান ও সাঁতার কাটার সময়ে হঠাৎই জলের নীচের চোরা স্রোতে চিরকালের মতো তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়ে গিয়েছিল এবং কপাল জোরে কোনমতে সেই যাত্রায় বেঁচে ফিরে আসার ও সুযোগ হয়েছিল…….. ইত্যাদি ইত্যাদি।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বন্ধু বান্ধবদের সাথে হঠাত্ পয়সা বিহিন অবস্থায় বিনি পয়সার বনভোজন করতে যাওয়ার উদ্দোগ ও অকর্স্মাত পরিকল্পনা করা হলো। পনেরো জন বন্ধু বান্ধব মিলে ইচ্ছাকৃতভাবে বিনা টিকিটে রেলে ভ্রমণ করা হলো, উদ্দেশ্যে বিহীন ভাবে অপরিচিত একটি রেল স্টেশনে নেমে যাওয়া হয়েছিল। প্রাইভেট টিউটরের প্রারিশ্রমিক বাবদ দেয় টাকা থেকে সঞ্চিত টাকা দ্বারা প্রত্যেক বন্ধুর জন্য দশ পয়সা করে মুড়ি ঘুঘনী কিনে ঐ অজানা রেলওয়ে স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দুরের এক অজ পাড়া গ্রায়ের এক অপরিচিত পরিবারের বাগানের নারকোল গাছ থেকে নারকোল আব্দার করে চেয়ে ও পেড়ে তাদেরই মেঠোবাগানে সারাদিন বনভোজন করে কাটিয়ে তবে বাড়ি ফেরা হলো।
ক্লাস এইটে পড়াকালিন হাফইয়র্লি পরীক্ষার সাতদিন পূর্বে ক্লাবের ফুটবল টুর্নামেনট চলাকালীন খেলার সময়ে এক বিশেষ বন্ধুর অনিচ্ছাকৃত আঘাতের জন্য পায়ে গুরুত্বর চোট লাগে। অভিজ্ঞ চিকিত্সকের মতো বাড়ির সবার অজ্ঞাতেই হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার এক মাস পূর্বে আঘাত সারানোর টুটকোটোটকা ঔষধ অর্জূন গাছের বাকল বেটে আঘাত সারানোর আপ্রান প্রচেষ্টা করা হল, ফলস্বরূপ পায়ের আঘাতের জায়গায় সেপটিক হয়ে গিয়েছিল।
মায়ের কড়া শাসনে বড়দাদার সাথে শিয়ালদহ বি আর সিং হাসপাতালে যেতে আমাকে বাধ্য করা হলো। হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা আমার অবস্থা দেখে বড়দাদার প্রতি সদয় হয়ে সুমধুর নরম গরম বিনিপয়সার বিশেষ উপদেশবানী ও ভৎসনাবানী প্রয়োগ ও প্রদান করলেন।
হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অপারেশন করে পা বাদ দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল,প্রায় ২০ দিন হাসপাতালের তত্বাবধানে চিকিত্সা করে সুস্থ হবার পর সেই সময়ে বাড়ি ফিরে আসার সুযোগ হয়েছিল, ইতিমধ্যেই আমাদের ক্লাস এইটের হাফ ইর্য়ালি পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়েছিল। ফল স্বরূপ ক্লাস এইটের হাফইয়র্লি পরীক্ষা দেওয়া থেকে আমাকে দুরাভিসন্ধি করে বঞ্চিত করা হলো।এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় যথেষ্ট ভালো রেজাল্ট করা সত্বে ও উর্ত্তিন করার ডিসিশন নিতে ক্লাস টিচার এবং বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডিকে বেগ পেতে হয়েছিল, কেন না অষ্টম শ্রেনীর হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় আমার প্রাপ্ত নম্বর ছিল ডবল শূন্য।
আমাদের বিদ্যালয়ের নিয়মাবলী অনুযায়ী ক্লাস এইটের হাফ ইয়ার্লির এবং ইয়ার্লির পরীক্ষার প্রাপ্ত নাম্বার অনুসারে ক্লাস নাইনে কলা, বানিজ্য, বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার সিলেক্সান ও সুযোগ মিলতো।
অগত্যা গার্জেন কল করা হয়েছিল ও পরবর্তিকালে এপ্লিকেশন লেটারের দ্বারা এবং বিগত সমস্ত ক্লাসের প্রাপ্ত ভালো ফলের রেকর্ড বিবেচনা করে ক্লাস টিচার এবং বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পরবর্তী শ্রেনীতে উর্ত্তীন করার ব্যাপারে বিবেচনা করার জন্য দুভিধামুক্ত করা হল এবং স্বসম্মানের সহিত বিজ্ঞান বিভাগে পড়ার অনুমতি পত্র আদায় করে বিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়ার সুযোগ হল।
ক্লাস নাইনে সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা চলা কালীন অঙ্ক, ইংরেজী বিষয়ে প্রাইভেট টিউশনি পড়ার সময় বিভিন্ন ধরনের মজার মজার ঘটনা ঘটেছিল।
বড় দিদির নার্সিং ট্রেনিং এর বৃত্তি মূলক প্রারিশ্রমিক বাবদ সেই সময়ের প্রাপ্য স্টাইপেন্ডের মাত্র আড়াইশো টাকা থেকে আমার ইংরেজির শিক্ষকের মাসিক বেতনের জন্য পঁচিশ টাকা মঞ্জুর করা হয়েছিল।
আমাদের কামরাবাদ হাই স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন মধুসূদন স্যার।ক্লাস নাইনে ইংরেজি সাহিত্যের প্রাইভেট শিক্ষক ছিলেন মধুসূদন স্যার,তার মাসিক গুরুদক্ষিনা পঁচিশ টাকা ছিল।প্রাইভেট শিক্ষককে (তথাকথিত মেধাবী ছাত্র হিসেবে) বিশেষ ভাবে প্রার্থনায়
কুড়ি টাকা দক্ষিণা দেওয়ার অনুমতি মঞ্জুর করার সৌভাগ অজর্ন করতে সমর্থ হই।অতিরিক্ত পাঁচ টাকার ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে ক্লাস নাইনে পড়াকালিন লোকাল সরকারী ব্যাঙ্কে একটি সেভিংস একাউন্ট খোলার সুযোগ হয়েছিল।
মধুসূদন স্যারের যাদবপুরের বাড়ি গিয়ে দলবেঁধে বিজয়া দশমীর প্রনাম করা বা মিষ্টি খাওয়ার ঘটনা আমাদের জীবনের একটা সুমধুর চিরস্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে।
মধুসূদন স্যার একটু রসকষ বিহীন রাসভারি প্রকৃতির স্যার ছিলেন। ঐ বয়সে করুদাকে আমরা একইসাথে স্যার ও বন্ধু মনে করতে পারতাম, কেন জানিনা, বোধ হয় ইংরেজি বিষয়ের সবারই কম বেশী ভয়ের কারণে মধুসূদন স্যারকে কখনোই তা মনে করতে পারতাম না। আমরা সবাই আমাদের বন্ধু সত্যেন মন্ডলের বাড়িতে মধুসূদন বাবুর কাছে প্রাইভেটে ইংরেজি পড়তাম।
স্যারকে বিজয়া দশমীর প্রনাম করে আমরা সবাই মিস্টি খাওয়ার আবদার করে মিস্টি খেতে চাইলাম, করুদা না চাইতেই বিজয়ার মিস্টি খাওয়াতেন। মধুসূদন বাবু একটু কৃপন প্রকৃতির ছিলেন এবং কখনোই আমাদের কাউকে কিছু খাওয়ান নি, তাই উনি বলেছিলেন ওনার বাড়ি গেলে মিস্টি খাওয়াবেন।
আমরা প্রায় কুড়ি জন ছাত্র ওনার কাছে প্রাইভেট টিউশনি পড়তাম। উনি যাদবপুর থাকতেন, এবং উনি ভেবেছিলেন বিজয়া দশমীর মিস্টি খাওয়ার জন্য ওনার বাড়িতে আমরা কেউ যাবো না।
আমরা ছাত্ররা স্যারের কাছ থেকে মিস্টি আদায় করার ব্যাপারে আমাদের ক্লাসের এক বন্ধুর সাথে একটা বেট লড়াই করলাম।
আমরা কুড়ি জন ছাত্র বিজয়া দশমীর পর স্যারকে আগে থেকে কিছু না জানিয়ে একটা রবিবারের সকালে, সবাই স্যারের পাড়ায় যাদবপুর পৌঁছে গেলাম।প্রথমে দুইজন স্যারের বাড়িতে গিয়ে বিজয়ার প্রনাম সেরে মিস্টি খেতে চাইলাম। স্যার দুইজন ছাত্রের জন্য বাড়ির কাজের লোককে দিয়ে মিস্টি আনার ব্যবস্থা করলেন। আমাদের বিজয়া দশমীর প্রনাম, গল্পের পর মিস্টি খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আবার স্যারের বাড়িতে আর ও দুইজন ছাত্রের প্রবেশ, স্যার আবার পরবর্তীকালে দুইজন ছাত্রের জন্য মিস্টি আনার ব্যবস্থা করলেন, আবার বিজয়ার প্রনাম ও মিস্টি খাওয়ার পর্ব শেষ হলো।আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতে লাগলো।অগত্যা স্যার আমাদের দুষ্টুমি বুদ্ধি বুঝতে পেরে জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন তোরা ঠিক করে বলতো, তোরা কতজন বিজয়া দশমীর প্রনাম সারতে এসেছিস। শেষে অবশ্য স্যার প্রয়োজনের অতিরিক্ত মিস্টি বাড়িতে একসাথে এনে সে যাত্রা রেহাই পেয়েছিলেন।
মধূসুদন স্যারের আর ও একটা কথা মনে পরে উনি মাঝে মাঝেই আমরা ভুলভাল ইংরেজি লিখলে বলতেন এই তোদের জন্যই তো ইংরেজরা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে । কে বলে স্বাধীনতা সংগ্ৰামিরা তাড়িয়েছেন.....।
আমার এক বাল্যবন্ধু চন্দনের বিভিন্ন রকম দুষ্টুমির স্মৃতি ভান্ডার আজ ও মনে দাগ কেটে আছে। হঠাত্ ই চন্দন চক্রবর্তীর কথা মনে পড়ে গেল। মন্দিরতলার (করুদার পাড়ার থাকতো) চন্দনের এক বাল্যবন্ধু বাবুয়া চন্দনকে তার বোনের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করতে ভুলে গিয়েছিল, চন্দন কিন্তু বিনা নিমন্ত্রণেই বাবুয়ার বোনের বিয়েতে হাজির। এই নিয়ে স্বভাবতই স্থানীয় ক্লাবে একটি সমালোচনার বিষয় হয়েছিল।
আমাদের অঙ্কের প্রাইভেট টিউটর সন্মানীয় শ্রীযুক্ত তুষার কান্তি দে অর্থাৎ করুদার কাণ অবধি আলোচনার বিষয় ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল। পরবর্তী কালে এই ব্যাপারে প্রাইভেট টিউশনি চলাকালীন চন্দন কে বিনা নিমন্ত্রণে বিয়ে বাড়িতে চন্দনের উপস্থিতির উদ্দেশ্যের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করাতে, চন্দনের উত্তর । “বাবুয়া কাজের চাপে বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করতে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু বন্ধু হিসেবে বন্ধুকে সাহায্য করা চন্দনের ও একটা কর্তব্য এবং বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোর তার ও একটা দ্বায়িত্ব আছে” , সে কিন্তু ভোলেনি, তাই বন্ধুকে সাহায্য করতে সে বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলো।
স্বর্গীয় করু দা ও এই মূহুর্তে আমাদের মধ্যে আর নেই । শিক্ষা দানের ব্যপারে যার অক্লান্ত পরিশ্রম ও অবদান আমাদের সকলের জীবনে অবিস্মরণীয় । আজ আমরা যে যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি সেটা স্বর্গীয় করু দার জন্য ই এটা সম্ভব হয়েছে । তাঁর বিদেহী আত্মাকে আমার অজশ্র নমস্কার জানাই।
আর ও এক বাল্যবন্ধু চঞ্চলের (খোকন) স্মৃতি ও মনে গভীর ভাবে রেখাপাত করে আছে। এই মূহুর্তে যাকে আমরা চিরদিনের জন্য হারিয়েছি। চঞ্চল খুবই মিশুকে, প্রাণোচ্ছল বন্ধু ছিল।
ও ফ্রি টাইমে খুবই মজা করতে ভালোবাসতো।
তখনকার সময়ে রেডিওতে সম্প্রসারিত বিবিধভারতীর সঙ্গীত অনুষ্ঠানের মাঝে বিজ্ঞাপনের ব্রেক আপ প্রচারের বিষয়বস্তু হুবুহু কপি করা ওর আলাদা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো।
ক্লাস ইলেভেনের আমাদের পড়াশোনার চাপের মধ্যে ও চঞ্চলের এইসব স্মৃতি মধুর ঘটনা আমরা খুবই উপভোগ করতাম।
ইতিমধ্যে আমরা বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা অনুযায়ী এন সি সি তে যুক্ত হয়ে বিদ্যালয়ের গন্ডীর বাইরে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের সাথে শিবির বা ক্যম্প এ যোগদান করা আরম্ভ করে দিয়েছিলাম।
নবম শ্রেণী অবধি পৌঁছে আবার আমরা আমাদের প্রিয় বন্ধুদের থেকে বিছিন্ন হয়ে সায়েন্স, কমার্স, আর্টস গ্রুপে পড়াশোনার জন্য নতুন নতুন বিভাগে আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে নতুনভাবে নতুন বিভাগে যুক্ত হলাম।
নবম শ্রেণীতে উর্ত্তীন হওয়ার পর আমাদের শিক্ষক এবং অভিভাবকগন আমাদের অলিখিতভাবে বড় হওয়ার অনুমতি পত্র প্রদান করে দিলেন।
বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানে আমরা প্রর্দশনীতে অংশ গ্রহণ করা এবং সরস্বতী পূজা কমিটিতে অংশগ্রহণ করার ছাড়পত্র পেলাম।
সরস্বতী পূজা ছাত্র জীবনে এক বিশেষ বার্তা বহন করে আনে। দলগতভাবে পূজা কমিটিতে অংশগ্রহণ করা, পূজার ঠাকুর আনার দ্বায়িত্ব, পূজার ফল, ফুল, মিস্টি, এবং অন্যান্য সামগ্রী বন্দোবস্ত করার দ্বয়িত্ব , বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ পত্র বিতরণ করার দ্বায়িত্ব বহন করার মধ্যে অন্যরকম অনুভূতির শিহরণ অনুভব করতে লাগলাম।ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ পত্র বিতরণ করার জন্য রীতিমতো দল বেঁধে নিজেদের মধ্যে বচসা, মারপিট লাগার উপক্রম হতো। সরস্বতী পূজার দুইমাস আগে থেকে আহ্বায়ক, সভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক, যুগ্ম হিসাব রক্ষক এবং প্রতি শ্রেণীর প্রত্যেক বিভাগের মনিটরদের নিয়ে (পঞ্চম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী অবধি, কেননা একাদশ শ্রেণীর দাদাদের বোর্ডের পরীক্ষার জন্য কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হতো না) আরো ২৫ জন সাধারণ সদস্যদের নিয়ে নতুন পূজা কমিটি গঠন করা হতো।
কমিটির সমস্ত সদস্যদের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হতো।
আনুমানিক প্রতিমা, ফল, ফুল, মিস্টি, খিচুড়ি ভোগের ইত্যাদির আয়োজন ও খরচ খরচা বাবদ আলোচনা হতো।
প্রতিটি শ্রেণীর ছাত্রদের কাছ থেকে সরস্বতী পূজার চাঁদা সংগ্রহ, সরস্বতী পূজার খরচ বাবদ বিদ্যালয়ের দেয় আর্থিক অনুদান , গত বর্ষের সরস্বতী পূজা কমিটির উদ্ভৃদ্য অর্থ ইত্যাদি নিয়ে নতুন কমিটির সভাপতি (একজন শিক্ষক দিলীপ স্যারের পরিচালনায়) আলোচনা আরম্ভ করেছিলেন।
বিদ্যালয়ের ছুটি না থাকলে ও সরস্বতী পূজার ৭ দিন আগে থেকে একাদশ শ্রেণী ছাড়া সমস্ত শ্রেণীর পঠনপাঠন বন্ধ হয়ে যেতো।
আমরা যাহারা কমিটির সাথে যুক্ত থাকতাম তাদের সরস্বতী পূজার ৭ দিন আগে থেকে প্রতি সদস্যদের স্নান, খাওয়া দাওয়া মাথায় উঠতো।
আমাদের সময়ে সাধারণত ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পরীক্ষা হতো এবং জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বার্ষিক ফলাফল ঘোষণা করা হতো।
প্রতি শ্রেণীর প্রত্যেক বিভাগের মনিটরদের দ্বায়িত্ব ছিল নিজ নিজ শ্রেণী থেকে বার্ষিক ফলাফল ঘোষণার দিন প্রতিটি ছাত্রের কাছ থেকে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে চাঁদা সংগ্রহ করা।
নবম এবং দশম শ্রেণীর সদস্য দাদাদের দ্বায়িত্ব থাকতো সরস্বতী প্রতিমার অর্ডার দেওয়া, আমন্ত্রণ পত্র ছাপানো, স্থানীয় অভ্যাগত বহিরাগত সন্মানীয় ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ভাবে আমন্ত্রণ জানানো, সমস্ত স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকশিক্ষিকাদের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ জানানো ইত্যাদি।
সরস্বতী পূজার ২ দিন আগে থেকেই সবাই মিলে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পূজার প্রয়োজনীয় সমস্ত সামগ্রী পত্র কিনে আনা বা আয়োজন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তাম।
পূজার আগের দিন সবাই মিলে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে প্রতিমা আনা, পূজার ফলমূল আনা, পূজার ভোগের সামগ্রী ব্যবস্থা করতে বেড়িয়ে পড়েছিলাম।
ফুল, বেলপাতা, তুলসী, কলাগাছ , ঘট, ঘটের ডাব ইত্যাদি আনার জন্য আর এক দল বেড়িয়ে পড়েছিল।
সিনিয়র দাদারা প্রতিমা ও পূজার মন্ডপের সৌন্দর্যায়ন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
সব কাজ এক এক করে শেষ করে সবাই বিদ্যালয়ে ফেরৎ আসার পরে এবং প্রতিমা নিয়ে আসার পর সারা রাত্রি ব্যপি আমরা সবাই মিলে আলাদা আলাদা দলে বিভক্ত হয়ে কোন দল ফল, কোনো দল খিচুড়ি ভোগের সবজি কাটার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়তাম।
সারা রাত্রি ব্যাপি প্রতিমা ও প্রতিমা মন্ডপের সৌন্দর্যায়ন ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য সিনিয়র দাদারা ও ব্যস্ত হয়ে পরতেন।
আমাদের কমিটির সভাপতি দিলীপ স্যার অবশ্য আমাদের ধোঁয়া পর্ব সারার জন্য অর্থাৎ নতুন নতুন বিড়ি সিগারেটের ধোঁয়া ওড়ানোর জন্য অলিখিত অনুমতি প্রদান স্বরূপ জেনে বুঝেই আমাদের সাথে রাত্রি যাপন করতে অস্বীকার করেছিলেন।
এই সময়ে এর মধ্যে জেনে শুনে ও কিছু দুস্টু মিস্টি ঘটনা ও ঘটেছিল।এরই মধ্যে রাতের অন্ধকারে স্থানীয় কোনো বাগানের মালিক কে না জানিয়ে নিজের মনে করে সারা রাত্রিব্যাপি ফিস্টের জন্য কচি ডাব জোগাড় করার দ্বায়িত্ব কোনো একদল স্ব ইচ্ছায় গুরুদ্বায়িত্ব বহন করার জন্য বেড়িয়ে পড়েছিল।
একই উপায়ে রাতের অন্ধকারে স্থানীয় কোনো বাগানের মালিক কে না জানিয়ে পাকা ফল বন্দোবস্ত করার জন্য আমরা কোমড় বেঁধে আমাদের দল নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলাম।
উপরি হিসাবে টর্চের আলোতে আশেপাশের ছোট ছোট খেজুর গাছে চড়ে নিঃশব্দে খেজুরের রসের হাঁড়ি নীচে নামিয়ে এনে হাঁড়ির মুখে রুমাল দিয়ে ঢেকে রস গলার্ধকরন করে পুকুরের নোংরা জল ভরে আবার গাছে উঠে হাঁড়িকে স্বস্থানে বেঁধে গাছ থেকে নেমে পাকা ফল নিয়ে বিদ্যালয়ে ফেরৎ আসলাম।
আবার অন্য একটি দল সরস্বতী পূজার মন্ডপের প্রবেশদ্বারের দুপাশে কলাগাছ লাগানোর উদ্দেশ্যে এবং পূজার ফুল, নৈবদ্য, কাটা ফল, ভোগের কাটা সবজি রাখার জন্য কলাপাতা সংগ্রহ করতে বেড়িয়ে পড়েছিল।
ফেরার পর নজরে এলো, কলাগাছ, কলাপাতার সঙ্গে ২ টি দেশি হাঁস ও আগাম পূজা কমিটির পিকনিকের জন্য নিয়ে এসেছিল।
বড় সিনিয়র দাদাদের জিজ্ঞাসা পর সরাসরি উত্তর ঐ দলের কোনো এক ছাত্রের বাড়ি থেকে পিকনিকের জন্য অগ্রিম হাঁসগুলো আনা হয়েছে। রাতারাতি হাঁসগুলোর পায়ে দড়ি বেঁধে নিকটবর্তী পুস্করিনীতে রাখার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
পরবর্তীকালে শোনা গেল হাঁস দুইটির প্রকৃত মালিক ঐ ছাত্রটির পাশের বাড়ির এক বিধবা দিদা।পরের দিন সকালে ঐ দিদা যখন তার ২টি হাঁস কম দেখতে পেলেন , তখন তার গ্রাম্যভাষায় দুই কান চাপা দিয়ে শোনার মতো বাক্যবান চালাতে আরম্ভ করেদিলেন।
ঐ সময়ে ঐ ছাত্রটি দিদাটিকে বুঝিয়ে ছিলো যে, সে স্বচক্ষে দিদার হাঁস দুইটিকে বিদ্যালয়ের সরস্বতী মায়ের শ্রীচরনে বসে থাকতে দেখেছিল।
পরের দিন ভোরবেলায় বাড়ি ফিরে স্নান পর্ব শেষ করে পাঞ্জাবি পায়জামা পরে আবার বিদ্যালয়ে উপস্থিত।সরস্বতী পূজার অঞ্জলী দেওয়ার সময়ে স্থানীয় একজন অপরিচিত রাজকন্যাকে প্রতিমার শ্রীচরনে পুস্প নিবেদন করার বাহানায় তাকেই পুস্প নিবেদন করে দিলাম।
সেদিন থেকে আমার প্রেমপর্বের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়ে গিয়েছিল।
সরস্বতী পূজার দিন আমাদের বিদ্যালয়ের ছাত্র এবং স্থানীয় অন্যান্য বিদ্যালয়ের ছাত্র, ছাত্রী ও অভ্যাগত স্থানীয় বহিরাগত শিক্ষক, শিক্ষিকা এবং অন্যান্য সন্মানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে প্রায় ২৫০০ জনের প্রসাদ, খিচুড়ি, বাঁধা কপির সবজি, টমোটর চাটনি, ও বোদের আয়োজন, বিতরণ করতে করতে দুপুর ১২ টা থেকে বিকাল ৫ টা বেজে গিয়েছিল।সেদিনকার মতো সন্ধ্যারতি সহযোগে সান্ধ্যকালীন পূজার পর্ব রাত ৮ টার মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল।
পরের দিন সকাল ১০ টার মধ্যে দধি মঙ্গলের আয়োজন শেষ করে একদল বিকাল ৩ টের মধ্যে প্রতিমা নিরঞ্জনপর্ব শেষ করার উদ্দেশ্যে প্রতিমা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো আর বাকি সদস্যরা রা দিলীপ স্যারের উপস্থিতিতে রাতের পিকনিকের আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো।
আলোচনায় স্থির হলো ভোগের উদ্ভৃদ্য চাল, আলু, ডাল, সবজি , তেল মশলা সব ই পিকনিকের জন্য ব্যবহার করা হবে শুধু প্রয়োজনীয় ১৫ কেজি মুরগির মাংস কেনার প্রয়োজন আছে।
আমাদের কমিটির সব সদস্য এবং বিদ্যালয়ের দারোয়ান, ঝাড়ুদার, সুইপার, এবং অফিস বয় মিলিয়ে মোট ৫০ জনের জন্য ভাত, চিকেন (আগে থেকে ব্যবস্থা করা হাঁস সহযোগে), একটি সবজি, চাটনি, পাপড় ও রসগোল্লার ব্যবস্থা করা হবে।
বিকেল ৫ টা থেকে সবাই পিকনিকের আয়োজনের জন্য উঠেপড়ে লেগে গেলাম।
রাত ৮.৩০ মধ্যে সবকিছু তৈয়ারি হওয়ার পর খাওয়াদাওয়া আরম্ভ হয়ে গেল।
রাত ৯.৩০ সময় দিলীপ স্যার এবং কমিটির কোর সদস্যরা অর্থাৎ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ এবং আমরা আর ও ৫ - ৬ জন খাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম চিকেন ক্যারিতে ক্যারি টাই পড়ে আছে কোনো চিকেন নেই ।দিলীপ স্যারকে এই ব্যাপারে অনুযোগ করার পর স্যারের সরাসরি উত্তর - "গামছা আছে, গামছা পড়ে চিকেনের বিরাট বড় হাঁড়িতে নেমে পড়ে যাহার যা চিকেন দরকার খুঁজে নাও"। এইভাবে আমাদের সরস্বতী পূজা পর্ব সম্পন্ন হয়েছিল।
তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। সামনে বোর্ডের পরীক্ষা। গাঢ় প্রেম করার জন্য সময়ের বড়ই অভাব অনুভব করেছিলাম।
সামনে বোর্ডের পড়াশোনার জন্য তৈয়ারি হওয়া, নিজের বিদ্যালয়ের পড়াশোনার চাপ সামলানোর সাথে সাথে নিজে ও নীচু শ্রেনীর কয়েক জন ছাত্রদের প্রাইভেট টিউশনি করতে আরম্ভ করে দিয়েছিলাম।
ফলে আমার প্রেমের মুকুল চার চোখের চাউনি, পাস দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু অব্যক্ত মন্তব্য প্রকাশের চেষ্টা বা কপাল খুব ভালো থাকলে সবার দৃষ্টির অন্তরালে ২ মিনিট অপ্রেমাচিত বাক্যলাপ। ব্যস এই অবধি।
সেই সময়ে উত্তম কুমার, অপর্না সেনের মেমসাহেব সিনেমাটি সবে হবে বিভিন্ন পিকচার হলে রিলিজ হওয়া আরম্ভ হয়েছিল। তাই আমার রাজকন্যাকে আমি মনে মনে মেমসাহেব বলে সম্বোধন করা আরম্ভ করে দিয়েছিলাম।
সেই একই সময়ে রঞ্জিত মল্লিক - মিঠু মুখার্জির মৌচাক সিনেমা টি হবে বিভিন্ন পিকচার হলে রিলিজ হয়েছিল।
আমার বন্ধুবান্ধবদের সাথে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের পাশ দিয়ে আমার মেমসাহেব তার বান্ধবীদের সাথে যাওয়ার সময় মৌচাক সিনেমার সেই বিখ্যাত গান - "প্রেম করেছি বেশ করেছি করবোই তো" গানটির ২ কলি গাইতে গাইতে পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল।
সেই দিনের পর থেকে আমার বন্ধুদের কাছে আমি কিছুদিন মজার খোরাক হয়েছিলাম।
এই বয়সে মাঝে মাঝে অনেক পুরাতন স্মৃতি মনের জানালায় উঁকি মেরে যায়।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার দিন আমাদের অঞ্চলে প্রত্যেক গৃহে যাহার যাহা সাধ্য সেইভাবে অনারম্ভর আয়োজনের দ্বারা সেইভাবে ফলমূল অবশ্যই নারকেল নাড়ু, পায়েস , খিচুড়ি সহযোগে ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনায় সবাই মন, প্রান, অন্তর দিয়ে পূজার আয়োজন করতেন।
তখনকার সময়ে আমরা ধনতেরাস এর মাধ্যমে ধনসম্পদের দেবীর আরাধনার সুযোগ পাই নি।
ভোর ভোর সকাল থেকে মায়েরা, মাসিমা, পিসিমারা, বড় বড় দিদিরা, ছোট ছোট বোনেরা নির্জলা উপবাস ব্রত পালন করে ফল, মুল, মিস্টান্ন, পায়েস, ভোগের খিচুড়ি, বিভিন্ন পদের ভাজি ও সবজির আয়োজন করার জন্য দিনভর লক্ষীপূজার আয়োজনে ব্যস্ত থাকতেন।
কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার নিঘন্ট অনুযায়ী পূজা, অঞ্জলী ও লক্ষী পূজার পাঁচালি পাঠের মাধ্যমে পূজা সম্পন্ন হতো।আমরা সবাই নিজ নিজ গৃহে পূজার প্রসাদ, পায়েস, খিচুড়ি গ্রহণ করে প্লাস্টিকের প্যাকেট নিয়ে দলবেঁধে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ঐ অঞ্চলের প্রত্যেক গৃহ থেকে নারকেল নাড়ু সংগ্রহ অভিযানে বেড়িয়ে পড়তাম। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নাড়ু সংগ্রহীতাকে ঐ দলের নায়ক হিসাবে নির্বাচিত করা হতো।
ঐ সময়ে নিজের পকেট মানি ব্যবস্থা করার জন্য নিজের স্কুল, কলেজ, প্রাইভেট টিউশনির মাঝখানে আমি ও আমার সুযোগ, সুবিধা এবং বিভিন্ন সময় অনুযায়ী কিছু ক্লাস এইট এবং নাইনের ৭ জন ছাত্র ছাত্রীদের অঙ্ক এবং বিজ্ঞান বিষয়ক বিষয়ে টিউশনি করতাম।
তার মাঝখানে কিছু ঘটনা চিরস্মরণীয় ছিল বলে আজও মাঝে মাঝে মগজের চিলেকোঠা থেকে ঘুলঘুলি দিয়ে উঁকি মেরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
আমাদের পরিবারের ই পরিচিত বাবার এক বন্ধুর ছেলেকে বছরের প্রারম্ভেই সপ্তম শ্রেণীর বিজ্ঞান ও অঙ্ক বিষয়ে টিউশনি পড়ানোর বিষয়ে আমার বড়দাদার মাধ্যমে নিদান পেলাম।
টিউশনি আরম্ভ করার পর বুঝতে পারলাম ছাত্রটি ভালো রেজাল্ট কেনো, উর্ত্তীন হওয়ার উপযুক্ত নয়।সেই সময়ে জুলাই মাসে অর্দ্ধবার্ষিকি এবং ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পরীক্ষার আয়োজন করা হতো।
ছাত্রটির মেধার গুনে হোক বা আমার টিউশনি পড়ানোর কারণে যেকোনো কারনেই হোক অর্দ্ধবার্ষিকি পরীক্ষায় ছাত্রটি অঙ্কে ১০০, বিজ্ঞানে ৮২ পেয়ে তার ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করে সবাইকে আশ্চর্য করে দিল।
ক্লাসের রেজাল্ট ঘোষণার পরের মাসেই তার অভিভাবকদের তরফ থেকে আমাকে অজানা কারণে (বোধ হয় ভেবেছিলেন তাদের সন্তানটির আর কোন ও টিউশনির প্রয়োজন নেই) ঐ ছাত্রটিকে টিউশনি না পড়ানোর ফরমান ঘোষনা করে দিলেন।
এই ঘোষণার ফল আমার শাপে বর হলো এবং আমি আমার নিজের একাদশ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার পড়াশোনার জন্য বেশি করে সময় দেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেলাম।
অবশ্য পরবর্তীকালে জানতে পারলাম ঐ ছাত্রটি ঐ ক্লাসের বাৎসরিক পরীক্ষায় খুবই সাধারণ মানের নম্বর পেয়ে উর্ত্তীন হয়েছিল ।
আমাদের স্কুলের নেপালি বাহাদুর যখন তখন স্কুলের গেটের বাইরে আমাদের বেরুতে দিতেন না, গেটে তালা দিয়ে রাখতেন।
আমরা মাঝে মধ্যে দুপুরে পালিয়ে স্থানীয় অন্নপূর্ণা সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে যেতে চাইতাম । নেপালি বাহাদুর সাহেব আমাদের বিদ্যালয়ের বাইরে যেতে বাধা দিতেন। তাই বলাই বাহুল্য ঐ নেপালি গার্ডের ওপর আমাদের সবার ই বাহাদুরের উপর রাগ ছিল।
হঠাৎ একদিন গরমের ছুটির পর আমরা আমাদের ক্লাসরুমে এমন কিছু অপ্রিয় বস্তু পড়ে থাকতে দেখলাম এবং সেটা বাহাদুরের বিরুদ্ধে প্রমান হিসাবে আমাদের মনে আগুনে ঘি ঢালার সামিল হলো।
ব্যাস আর যায় কোথায় আমরা সবাই গরম হয়ে উঠেছিলাম, রহস্য উদঘাটনের বিশাল আনন্দ, সাথে সাথে বদলা নেওয়ার সুযোগ একেবারে হাতছাড়া করতে পারলাম না, সবাই রুটমার্চ করে টীচার্স রুমে, এবং তারপর হেড স্যারের চেম্বারে উপস্থিত, সংগে সংগে শ্লোগান - বাহাদুরের শাস্তি চাই, শাস্তি চাই ... বাহাদুর হঠাও .... টীচার্সেরা সবাই থতমত। খুব সম্ভবত সেই বছর ক্লাস ইলেভেন এ আমাদের ক্লাস টিচার্স ছিলেন বাংলা সাহিত্যের টিচার্স সুভাষ বাবু। হেডসার নির্মল স্যার, সুভাষ বাবুকে দ্বায়িত্ব দিলেন ব্যাপারটাকে সামলানোর জন্য।
আমাদের যেহেতু স্কুলে লাস্ট ইয়ার ছিলো, তাই সুভাষ স্যার সব স্টুডেন্ট দের কাছে ঘটনাটি বিশদে শুনে সবাইকে এই নিয়ে কোনোরকম ঝামেলা করতে বারন করলেন।
প্রতি বছর দূর্গা পুজার ছুটির আগে ফোর্থ ক্লাস স্টাফদের বখশিস দেওয়ার জন্য সারা স্কুলের ছাত্রদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হতো।
বাহাদুরের ঘটনা নিয়ে আমরা এতটাই রেগে ছিলাম, তাই ফোর্থ ক্লাস স্টাফদের বখশিস দেওয়া আমরা বয়কট করলাম এবং সেই বছরে কেহই আমরা ফোর্থ ক্লাস স্টাফদের বসশিস দেবো না ঠিক করলাম।
যেটা স্কুলের রেকর্ডে প্রথমবার ঘটেছিল। এই অমানবিক ঘটনা নিয়ে আমাদের ক্লাসের কয়েকজনকে টিচার্স রুমে কল করে প্রচন্ড অপমান, তিরস্কার ও মারধোর করা হয়েছিল।
কয়েকদিন পরেই আমাদের টেস্ট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হল এবং বিদ্যালয়ের নবীন বরণ ও প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হল।
আমরা ক্লাসের প্রতিটি ছাত্র নিজেদের প্রত্যেকের পকেটমানি থেকে টাকা সংগ্রহ করে স্কুলের প্রবীন বিদায়ী অনুষ্ঠানে কামরাবাদ হাই স্কুলের রেকর্ডে প্রথম বার , হেড স্যারের জন্য ফুলের বুফে, সাল এবং স্কুলের জন্য সুকান্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের ফোটো ও সুকান্ত, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল রচনাসমগ্র স্কুল লাইব্রেরিকে স্মৃতিচিন্হ স্বরূপ প্রদান করেছিলাম।
ফল স্বরূপ যেসব স্যারেরা একদিন আমাদের ক্লাসের ছাত্রদের তিরস্কার করেছিলেন, তারা সেই বিদায়ী অনুষ্ঠানে আমাদের বিদায়ী ছাত্রদেরকে বাহবা ও ধন্য ধন্য করতে বাধ্য হন।
এর পরবর্তীকাল থেকে প্রতি বছর সকল বিদায়ী ছাত্রদের তরফ থেকে স্কুলকে স্মৃতিচিন্হ স্বরূপ হিসাবে কিছু না কিছু দেওয়ার চল আরম্ভ হলো।
হঠাত্ একদিন স্কুলে পৌঁছে দেখি ... অনেক ছেলে ও কয়েক জন স্যার রে রে করে বেরুচ্ছে হিপিদের মারার জন্য , যে যা হাতে পেয়েছে তাই নিয়ে, তখন আমরা নাইন- টেনের স্টুডেন্ট .. ইলেভেনের খ বেশি ছিল, একটি ছেলের কথা মনে পরে , ব্যায়াম করত সম্রাট ইয়া চেহারা ছিল, হাতে একটা চ্যালা কাঠ নিয়ে দৌড়ুতে দেখলাম, হিপিরা কেউ নাকি আমাদের কোনো স্কুলের ছাত্রকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল ...
সেদিন অনেকক্ষন স্কুলে ক্লাস বন্ধ ছিল... বিকেলে ফেরার সময় স্টেশনে ছেঁড়া জামা কাপড়ে ছেলেটাকে দেখেছিলাম, বাধ্য হয়েছিল পালাতে, স্কুলের কিছুটা দুরেই একটা দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে ওরা থাকতো, ঢোল করতাল আরো নানা বাদ্য যন্ত্র নিয়ে হরে রাম করত গাঁজা খেয়ে ...অনেকে ওদের অনেক কিছু লুট করে নিয়েছিল ... ।
হিপিগুলো স্কুলের একটু দুরে মেয়েদের স্কুলের উল্টো দিকে রেলওয়ে কেবিনের পিছনে একটা দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতো। ʼ
আমরা বায়োলজির টিচার সুকেষ স্যারের কাছে এন সি সির ট্রেনিং নিতাম। এন সি সি করার জন্য ঝিলের পাড়ের বাগানে প্র্যাকটিস করার সময় খুব সকালে দেখতাম ছেলে মেয়ে হিপিগুলো স্লিপিং ব্যাগে মাঠের মধ্যে ঘুমাতো।
ইতিপূর্বে একটা খারাপ অভ্যাস রপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
রাস্তায় কুকুরের বাচ্চা দেখলেই রাস্তা থেকে তুলে বাড়িতে এনে পরিচর্যা শুরু করে কুকুরের বাচ্চাটিকে বড় করার প্রবনতা।
প্রথম প্রচেষ্টার ফল খুব একটা সুখদায়ক ছিল না, কুকুরের বাচ্চাটি প্রাতকর্ম করার উদ্দেশ্যে সবার অজ্ঞাতেই পুকুরের ধারে চলে যায় এবং পুকুরের জলে পড়ে ডুবে মারা যায়, পরবর্তীকালে জলের উপর কুকুর বাচ্চাটির দেহ ভেসে ওঠার পর সবার দৃষ্টিগোচর হয়।
দ্বিতীয় প্রচেষ্টার ফল ও সুখদায়ক ছিল না।
কুকুরের বাচ্চাটি সবার অজ্ঞাতেই কোনো বিষাক্ত পোকা খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং আমাকে কামড়ে দেয়, ফল স্বরূপ ইয়া বড় বড় সিরিঞ্জে আমাকে চোদ্দটি ইন্জাক্সন নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। ঐ সময়ে কুকুরের বাচ্চা টি ও আমারই বিষে ইনফেক্টেড হয়ে মারা যায়।
তৃতীয় প্রচেষ্টার ফসল আমি একশোভাগ কৃতকার্য হই।
বাড়ির পাশেই চোদ্দ পনেরোটি কুকুরের বাচ্চা সহিত মা কুকুরের হিমসিম খাওয়ার উপক্রম। তার মধ্যে দুই তিন টি রুগ্ন কুকুরের বাচ্চা না খেতে পেয়ে মারা যায়, দুই একটা কুকুরের বাচ্চা যথেষ্ট পরিমাণ খাবার না পেয়ে অসুস্থ হতে আরম্ভ করল, তার মধ্যে একটি রুগ্ন ও অসুস্থ কুকুরের বাচ্চাকে তুলে এনে মানুষের বাচ্চাদের মতো দুধের বোতল ব্যবহার করে সেবাশুস্রসা ও পরিচর্যা শুরু করে দিলাম, পরবর্তীকালে কুকুরের বাচ্চাটির নাম রাখলাম টম।
কুকুরটি প্রায় দশ বছর বেঁচে ছিল এবং কুকুরটির প্রভুভক্তির কর্মকাণ্ড এই দশ বছরের মধ্যে বহু কর্মকাণ্ড উদাহরণযোগ্য ও সেই সু-নামটি ও চির অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
টমের কর্মকাণ্ডের কিছু কিছু ঘটনা উল্লেখ না করলে তার সমন্ধে তার প্রতি অন্যায় করা হবে।
ছোট থেকেই টম আমার, মায়ের ও ছোট বোনের খুবই ন্যাওটা ছিল, মা ও ছোট বোনের মাঝখানে ছাড়া বাবুর ঘুমই হতো না। আমাদের উদ্ভিত্য খাবারই ছিল তার খাবার, সেটা ভাত, ডাল, মুড়ি বা রুটি মতো খাবার ও তার খুবই প্রিয় খাবার ছিল। আমাকে কর্ম জীবনে প্রচুর পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ঘুরে বেড়াতে হতো। ভোর চারটের সময় ট্রেন ধরার জন্য বাড়ি থেকে রেলওয়ে স্টেশন অবধি প্রায় দশ মিনিটের পথে ভিন্ন এলাকার কুকুরদের এড়িয়ে সে আমার নিত্য দিনের সঙ্গী হতো। অফিসের টুর থেকে ফেরার সময় বাড়িতে প্রবেশের পূর্বেই টমের ঘ্রানশক্তি দ্বারা পরিবারের সবার আগে থেকে আমার আগমন বার্তা ঠিকই সে আগে থেকেই বুঝতে পারতো।
টুর থেকে ফিরে পাড়া প্রতিবেশি কোনো বন্ধুর বাড়ি গেলে তাকে ও যাওয়া চাই এবং সরাসরি বন্ধুর বাড়িতে প্রয়োজনীয় পারমিশন ছাড়াই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়তো।
বাবা চাকরি জীবন শেষ করার পরে কিছুটা আধ্মাতিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই কারনে কখনো কখনো কয়েক দিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে ঐ সব স্থানীয় আশ্রমে গিয়ে ছিলেন।
সেই সময়ে কয়েক দিনের জন্য টমকে ও খুজে পাওয়া যেত না। পরে জানতে পারতাম টম ও ঐ কদিন ঐ আশ্রমেই দিন কাটাতো , বাবা কিন্তু টমকে খুব একটা পচ্ছন্দ করতেন না।
আমার বিবাহের পর আস্তে আস্তে আমার মিসেসর সাথে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, আমি অফিসের কাজে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে টুরে থাকাকালীন আমার বিধবা মা ও আমার মিসেস ছাড়া বাড়িতে কেহই থাকতো না, সেই সময়ে আমার অবর্তমানে টমই তাদের বডিগার্ড হিসেবে কাজ করত। বিশেষ করে রাতেরবেলায় মিসেসের খাটের নীচেই শুয়ে থাকত এবং
বডিগার্ড হিসেবে প্রভুর প্রভুর প্রতি তার
ডিউটি পালন করতো।
পরবর্তীকালে ঘটনাক্রমে একজন শিক্ষিত প্রতিবেশির তাদের সৌখিন কুকুরকে প্রাতঃভ্রমণে সঙ্গ দেওয়ার সময়ে সদয় হয়ে টমের মাথায় বড় ডান্ডা দিয়ে অহেতুক আঘাত করে এবং ব্রেনে আঘাতের পরিনাম স্বরূপ টমের ব্রেনস্টোক হয় এবং টমকে আমি অকালে চিরকালের জন্য হারাতে বাধ্য হই।
টমকে আমি পূত্রবত মানুষ করে বড় করেছিলাম এবং ভায়ের মত ভালোবাসতাম এবং ফলস্বরূপ টমের স্মৃতি আজও এই বয়সে আমি বয়ে বেড়াচ্ছি।
ক্লাস টেনে পড়াকালিন দেওঘরের সৎসংগ আশ্রমে সমবয়সী এক বন্ধু সমরের সাথে পরিচয় হয় এবং দুজনেরই ক্লাস ইলেভেনের ফাইনাল বোর্ড এর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ছাত্র ছিলাম এবং পরীক্ষার পর দুজনই দুইমাস ব্যাপী বিশ্ব ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ব্লু প্রিন্ট তৈরি করি।
সমরের মামার বাড়ি কোলকাতায়, বাড়ি জলপাইগুড়িতে, সমর ও আমার মতো কপর্দকশূন্য ডানপিটে বেকার যুবক ছিল ।
তারই এক জলপাইগুড়ি নিবাসী সমবয়সী বাল্যবন্ধু শ্যামল, ঐ সময়ে দিল্লিতে থাকতো এবং দিল্লির ভারতসেবাশ্রম সংঘে কর্মরত ছিল।
শ্যামলের দ্বায়িত্ব ছিল- সারা ভারতবর্ষের ভ্রমনে যত ভারত সেবাশ্রম সংঘ আছে এবং কন্যাকুমারী সংঘের প্রতিষ্ঠানে আছে (যত ধর্মীয় স্থানে) সেখানেই বিনি পয়সায় থাকা ও খাওয়ার পরিষেবার সুযোগ দিল্লির ভারতসেবাশ্রম সংঘের প্রধানের কাছ থেকে অনুমতি পত্র আদায় করা।
ধর্মীয় স্থান ব্যতীত অন্য স্থানে থাকার ব্যবস্থা রেলওয়ে ব্রেকজার্নি করে রেলওয়ে স্টেশনের রিটায়ারিং রুমে কম পয়সায় থাকার ব্যবস্থা। কারন ভারতের কোথাও হোটেলে থাকার আর্থিক ক্ষমতা আমাদের ছিল না।
আমার দ্বায়িত্ব ছিল - সমরের জন্য সারা ভারতবর্ষের ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ফ্রি রেলওয়ে দ্বিতীয় শ্রেনীর এটেন্ডেন্ট পাস ব্যবস্থা করা, যেটা রেলওয়ে বোডের্র নিয়ম অনুসারে প্রথম শ্রেনীর রেলওয়ে কর্মচারীর পরিবারের সংগে একটি ফ্রী দ্বিতীয় শ্রেনীর এটেন্ডেন্ট পাস রেলওয়ে কর্মচারী পরিবারের প্রাপ্য।
সমরের দ্বায়িত্ব ছিল - দুইমাস ব্যাপী ভারতবর্ষ ভ্রমণের সময় সকাল বিকালের শুকনো জলখাবার বিস্কুট, মুড়ি, চিড়া, খই, চানাচুর, বাদাম ভাজা, ছোলা ভাজা, গুড়, বাতাসার মত শুকনো খাবারের বন্দোব্যবস্থা করা। আর ভারতভ্রমণ কালে পানীয় জলের ব্যবস্থা বাবার রেলওয়ে কোম্পানিই ফ্রী তে ব্যবস্থা করবে।
যেকোনো শহরের ভ্রমণ অবশ্যই লোকাল বাস বা গন পরিবহন ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হতে হবে।
বাকি প্রাত্যহিক দুই বেলার খাবার জোগান দেবে রেলওয়ে ক্যান্টিন, রাস্তার ধারের কম বাজেটের ফুড স্টল বা ধরমশালা ইত্যাদি ইত্যাদি।
পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক ইলেভেন এ ফাইনাল পরীক্ষার পর ষোলো বছর বয়সে বাবাকে অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে বাবার কাছ থেকে এক সেট রেলওয়ে ফার্স্টক্লাস পাস (সংগে বন্ধুর জন্য ফ্রি দ্বিতীয় শ্রেনীর এটেন্ডেন্ট পাস) ও পিটিও এবং আমার প্রাইভেট শিক্ষকের ফিস থেকে সঞ্চয়ের অতিসামান্য সঞ্চয়ের অর্থরাশি (Rs ৫ x ১২ মাস x ৩ বছর যাবৎ সঞ্চিত অর্থ = Rs ১৮০/- + ক্লাস ইলেভেনের ফাইনাল বোর্ড এর হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার টেস্ট পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারের জন্য বিশেষ বৃত্তিতে পাওয়া Rs ৭৫/- + আমর প্রাইভেট টিউশনি বাবদ উপার্অজিত অতি সামান্য সঞ্চিত অর্থ Rs ৫০০/- + Rs ১০০/- দিদির কাছ থেকে আব্দার করে আদায় করা + Rs ১৫০/- বাবার কাছ থেকে আব্দার করে আদায় করা = মোট Rs ১০০০/- সম্বল) নিয়ে বিশ্ব ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ভগবানের নাম করে সমর ও শ্যামল দুইজন সৎসংগী বন্ধুর সাথে দিল্লি, মাদ্রাস, পন্ডিচেরি, মাদুরাই, নাগোরকয়েল, কোডাইক্যানাল, কোয়েম্বাটোর, উটি, এরনাকুলাম,কোচিন, ত্রিবান্দ্রম, কন্যাকুমারী ও দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের উদ্দেশ্যে দুই মাসের জন্য একা একা ঘরছেড়ে বাহির হয়েছিলাম।
আমাদের পরিকল্পনা ছিল বাবার থেকে যৌতুক পাওয়া পাস, পিটিও তে রেলওয়ে প্রী-প্রোগ্রাম সিলেক্টেড টুররুট অনুযায়ী বিনি পয়সায় ভারতবর্ষ ভ্রমন।
ট্রেনে ভ্রমণকালীন সময়ের প্রথম পর্বে বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া পরোটা, সবজি, মিষ্টি, শুকনো খাবারের উপর আমরা নির্ভরশীল ছিলাম।
দর্শনীয় স্থানে ব্রেক জার্নী করে রেলওয়ে স্টেশনের রিটায়ারিং রুমে কম পয়সায় থাকার সুবন্দোব্যবস্থা ছিল।
দর্শনীয় স্থানে লোকাল বাসে জোড়াতালি সম্বল ইংরেজি ব্যবহার করে ভ্রমন।রাস্তার ধারে কম বাজেটের স্টলে দিনে দুই পাত পরিমিত পরিমাণে খাওয়া দাওয়ার সুবন্দোব্যবস্থা করা হয়েছিল।
কলিকাতা থেকে প্রচুর পরিমাণে শুকনো জলখাবার - চিড়া, মুড়ি, খই, বিস্কুট, চানাচুর, বাদাম ভাজা, ছোলা ভাজার প্রচুর পরিমাণে স্টক রাখা হয়েছিল বাজেটকে ঠিক রাখার জন্য।
ভারত ভ্রমণের প্রথম পর্বে আমি ও সমর মিলে হাওড়া থেকে দিল্লিতে যাওয়ার সময়ে - প্রথমে বেনারসের দর্শনীয় স্থান যেমন , মোগলসরাই এর দর্শনীয় স্থান,গয়া এর দর্শনীয় স্থান যেমন বিষ্ণুপদ মন্দির, রাজ্ত্ন ট্রি, মঙ্গলাগৌরি মন্দির, গয়া পান্ডা দান, কাশী, বৃন্দাবন,আগ্রার দর্শনীয় স্থান যেমন ভ্রমণ তাজমহল, আগ্রা দুর্গ, ফতেপুর সিক্রি, আকবর স্তূপ, সিকান্দার দুর্গ ইত্যাদি স্থানে ঘুরে দেখার পর্ব সমাপ্ত করে নিই।
দিল্লির বন্ধু শ্যামল দিল্লি থেকে আমাদের সংগে ভারত ভ্রমণের সঙ্গী হয়েছিল।
দিল্লিতে থাকাখাওয়ার ব্যবস্থা শ্যামলের মাধ্যমে বিনি পয়সায় ভারত সেবাশ্রম সংঘে হয়েছিল।
সেই সময় বন্যার কারণে দিল্লির যমুনা নদীর দুই পাড় প্লাবিত হয়েছিল।
দিল্লিতে থাকাকালীন আমরা তিন বন্ধুই ভারত সেবাশ্রম সংঘের ফ্রী রিলিফ ডোনেসান ক্যম্পের অংশীদার হয়ে ভারত সেবাশ্রম সংঘের মহারাজের তত্ত্বাবধানে দুর্গত মানুষের সেবায় ঐ বয়সে নিজেকে নিয়োজিত করার সৌভাগ ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার সুযোগ অর্জন করেছিলাম।
দিল্লিতে থাকাকালীন দিল্লির দর্শনীয় স্থান যেমন ইন্ডিয়া গেট, হুমায়ূন স্তূপ, যন্তর মন্তর, রাষ্ট্রপতি ভবন, রাজ ঘাট ইত্যাদি স্থানে ঘুরে দেখার সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলাম।
পরবর্তী ভারতবর্ষ ভ্রমণের দ্বিতীয় অংশ শুরু হয় দিল্লি থেকে মাদ্রাজের উদ্দেশ্যে।
কথায় আছে আমার মতো অতি ভালো ছেলে যেখানেই যায়, উটকো ঝামেলা যায় তার পিছু পিছু।
আমি রেলওয়ে প্রথম শ্রেনীর যাত্রী হওয়ার সুবাদে আমার প্রথম শ্রেনীর কোচ এবং সমর ও শ্যামলের দ্বিতীয় শ্রেনীর কোচ, প্যন্টিকার, জেনারেল শ্রেনীর কোচ , প্রথম শ্রেনীর এ সি কোচ ইত্যাদির জন্য পাঁচটি কোচের ব্যবধানে ছিল।
প্রথম শ্রেনীর কোচ এটেন্ডেন্টের সাথে কথা বলে (কম বয়সী রেলওয়ে কর্মচারীর সন্তান পরিচয়ে) প্রায় সারাদিনই তিন বন্ধু একসাথে দ্বিতীয় শ্রেনীর কোচে হৈ হূল্লুর করে সময় কাটাতাম এবং মাত্র রাত্রি বেলায় খেয়েদেয়ে শান্ত ছেলের মতো ঘুমানোর জন্য আমি প্রথম শ্রেনীর কোচে ফিরে আসতাম।
ট্রেনে ভ্রমণকালীন এক দিন তিন বন্ধু দ্বিতীয় শ্রেনীর কোচে রাত্রের আহার করতে করতে প্রায় রাত এগারোটা বেজে গিয়েছিল এবং খাওয়া দাওয়ার পর জানতে পারলাম ট্রেন থামার পরবর্তী গন্তব্য স্টেশনের পৌঁছানোর সময় ছিল রাত্রি প্রায় আড়াইটায়।
অগত্যা সেই মুহূর্তে আমার পক্ষে আমার প্রথম শ্রেনীর কোচে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না এবং পরবর্তী গন্তব্যে ট্রেন স্টপেজের জন্য বন্ধুদের সাথে দ্বিতীয় শ্রেনীর কোচে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
হঠাত্ ই রাত্রি সম্ভবত একটা নাগাদ লাল সিগন্যালের জন্য ট্রেন কোনো এক অপরিচিত শুনশান জায়গায় দাড়িয়ে পরেছিল।
সেই মুহূর্ত থেকে আমার সুসময় শুরু হয়ে যায় এবং আগে পরে না ভেবে অবিবেচকের মতো অন্ধকারের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেনীর কোচ থেকে নেমে প্রথম শ্রেনীর কোচে ফিরে আসবার জন্য রেলওয়ে লাইনের অসমান পাথরের ওপর দিয়ে ছুটতে আরম্ভ করে দিলাম, একে শুনশান গভীর রাত, রেলওয়ে লাইনের পাথরের ওপর নিঃশব্দ গভীর রাতের দৌরানোর শব্দে চকিতে পরমুহূর্তে ট্রেনের ডিউটিতে থাকা রেলওয়ে সিকিউরিটি গার্ডদের আট দশটি অত্যন্ত জোরালো টর্চের আলো আমার উপর এসে পড়ে এবং ফায়ারিং করার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে সমবেতভাবে হল্ট হল্ট নির্দ্দেশ আসতে আরম্ভ করল, আর আমি ও কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাড়িয়ে পড়তে বাধ্য হই।
অগত্যা আট দশজন রেলওয়ে সিকিউরিটি গার্ড জিরো পয়েন্টে টার্গেট করে ধীরে ধীরে আমাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে।
আমি আমার অবস্থা তাদের বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকি, যেখানে ভাষার আদানপ্রদান এক বিরাট বাধা। তারা সমবেতভাবে আমাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে আরম্ভ করে দেয়।
কপালগুনে তাদের মধ্যে একজন সিনিয়ার সিকিউরিটি গার্ড অফিসার বাঙালি ছিলেন, তাকে পুরো ঘটনাটা বোঝাতে কৃতকার্য হই ও পরিশেষে আমাকে সমবেতভাবে এস্কট করে আমার প্রথম শ্রেনীর কোচ এটেন্ডেন্টের কাছে নিয়ে উপযুক্ত আমার সংঘের রেলওয়ে পাস এবং অন্যান্য রেকর্ড ভেরিফিকেশন ও কনফর্মড করে আমাকে আমার প্রথম শ্রেনীর কোচে পৌছে দিয়ে যান এবং কোচ এটেন্ডেন্টকে হ্যন্ড ওভার করেন।
মাদ্রাজে পৌছে আমরা জার্নি টিকিটের ব্রেকজার্নি করে আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী আমাদের থাকবার ব্যবস্থা রেলওয়ে রিটায়ারিং রুমে, জিনিসপত্র রেলওয়ে লকরুমে, খাবার দাবারের ব্যবস্থা রেলওয়ে ক্যান্টিনে আয়োজন করে শহরের দর্শনীয় স্থান যেমন পেদাম্বুরু যেখানে রাজিব গান্ধীর হত্যালীলা সাঙ্গ হয়েছিল সেই স্থান, মাদ্রাস হাইকোর্ট, মেরিনা সী বিচ, বেসন্তনগর সী বীচ, কোভেলং সী বিচ, গ্লোডেন সী বীচ, এলিয়ট সী বীচ, কপিলেশ্বর মন্দির, মহাবলীপুরম মন্দির, আস্থা লক্ষ্মী মন্দির, গিন্ডী ন্যাশানাল পার্ক এবং পন্ডিচেরি শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে মীনাক্ষী মন্দির, নল্বক্ষ মন্দির দর্শন করে আর ও দক্ষিণ ভারতের দিগে এগিয়ে গেলাম।
বিভিন্ন দর্শনীয় ও ধর্মীয় স্থানে ভ্রমণ চলাকালীন মাদুরাই রেলওয়ে স্টেশন থেকে ত্রিবান্দ্রম যাওয়ার উদ্দেশ্যে টিকিট বুকিং এর জন্য আমরা তিন বন্ধু টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে হাসি মজাক করার সময় অপরিচিত পরিবেশে ও স্থানীয় লোকজনের কাছে আমাদের ভাষা তাদের কাছে অবোধ্য হওয়ার জন্য স্থানীয় লোকজনের দৃষ্টিগোচর হই।
হঠাত্ ই একজন কালোকুচকুচে নিগ্রোমত ভদ্রলোক (যদিও মিস্টার পিল্লাই নিগ্রো ছিলেন না, দক্ষিণ ভারতবর্ষেরই বাসিন্দা) আমাদেরকে লক্ষ করে এগিয়ে আসেন এবং অবোধ্য ভাষায় কিছু জিজ্ঞাসা করেন, যেটা আমাদের কাছে বোধগম্য ছিল না।
অগত্যা আমরা জোড়াতালি ইংরেজি ভাষাতে তাকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছিলাম যে আমরা ওনার ভাষা বুঝতে পারছি না। ঐ ভদ্রলোক ইংরেজিতেই নিজেকে একজন কোনো স্থানীয় বিখ্যাত হাসপাতালের অভিজ্ঞ নিউরো সার্জেন প্রধান হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন
উনি ও আমাদের বয়স ও ভিন্ন রাজ্যের ভিন্ন ভাষাভাষী হওয়ার কারণে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে আরম্ভ করলেন। কোন রাজ্য থেকে আসছি, কেন আমরা সেখানে, কি জন্য আমরা ঐ স্থানে এসেছি এবং কোথায় যাবো ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
আমরা আমাদের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর রাজ্য থেকে ভারত ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে এত কম বয়সে বেরিয়েছি শুনে কেন জানি না মিঃ পিল্লাই আমাদের সমন্ধ কৌতুহল বেড়ে গিয়েছিল। উনি আমাদের কে কিছুতেই সংগছাড়া করতে চাইলেন না। মিঃ পিল্লাই নাগোরকয়েল এ যে হাসপাতালে ছিলেন সেটা আমাদেরই গন্তব্যস্থল ত্রিবান্দ্রমে যাওয়ার পথেই পরবে বলে জানালেন।
ডাঃ পিল্লাই কোনো এক বিশেষ ধরনের অপারেশনের উদ্দেশ্যে তিন দিন পূর্বে নাগোরকয়েল থেকে মাদুরাই এসেছিলেন। ট্রেনে মাদুরাই থেকে নাগোরকয়েল দশ ঘন্টার জার্নি। বাই রোড ছয় ঘন্টা। ওনার ইচ্ছে আমরা ওনার ব্যক্তিগত কারে এই ছয় ঘন্টা ওনাকে নাগোরকয়েল অবধি সঙ্গ দিলে উনি খুবই আনন্দিত ও খুশি হবেন।
ওনারই পরিচিত এক বন্ধু কন্যাকুমারী সংঘ প্রতিষ্ঠানের মাননীয় প্রধান সদস্য। উনি আমাদের বিনা খরচে ত্রিবান্দ্রম, কন্যাকুমারী, বিবেকানন্দ রক টেম্পলের যাতায়াত, ঘোরাফেরা , থাকাখাওয়ার, লোকাল গাইডের ব্যবস্থা এবং বিবেকানন্দ রকট্যম্পেল যাওয়ার প্রয়োজনীয় বিশেষ পারমিশন পত্র বা ভিষার ব্যবস্থা করে দেবেন আশ্বাস দিলেন।
কেননা সেই সময়ে নিয়ম অনুযায়ী বিবেকানন্দ রক টেম্পলে যাওয়ার জন্য বিশেষ ভিষার প্রয়োজন হত।
আমরা সেই মূল্যবান সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইলাম না এবং ওনার সাদর আমন্ত্রণ সানন্দে গ্রহণ করিলাম। উনি প্রথমেই আমাদের সবাইকে একটি বড় রেস্তরাঁয় নিয়ে গেলেন এবং সবাইকে নিয়ে পেটপুরে প্রসিদ্ধ দক্ষিণভারতীয় ভূরিভোজের আয়োজন করলেন।
মাদুরাই থেকে নাগোরকয়েলের এই ছয় ঘন্টার যাত্রাকালীন দৃশ্যপট অতিব মনোরম। ছোট বড় পাহাড়, পর্বত, বন, জঙ্গল, গ্রাম্য লোকালয়, বড় কসমপলিটন শহর, নদী, নালা, সবুজ অসমান ঢেউ খেলানো শস্যক্ষেত্রের মনোরম দৃশ্যের অভিজ্ঞতা সত্যিই বর্ণনার অতীত।
নাগোরকয়েল পৌছে ডাঃ পিল্লাই আমাদের কে নিয়ে নিজে সমগ্র হাসপাতাল, সেখানকার মেডিকেল ব্যবস্থার সমস্ত সুযোগ সুবিধা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালেন, তার বাড়ি নিয়ে গিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং পুনরায় যথার্থ দক্ষিনভারতীয় ভূরিভোজ সহকারে নাগোরকয়েল থেকে ত্রিবান্দ্রম যাওয়ার সুন্দর সুবন্দোব্যবস্থা করে দিলেন।
তার এই অপরিচিত আমাদের তিন বন্ধুর প্রতি অকৃপণ আতিথ্য, ভালোবাসা, এই বহু মূল্যবান প্রয়োজনের অধিক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা আমাদের মনে অনেক অনেক কাল দাগ কেটে ছিল।
ডঃ পিল্লাইর কথামতো এবং তারই বন্ধুর প্রতি স্বহস্তে লিখিত অনুমতিপত্র অনুযায়ী লোকাল গাইড সমেত ত্রিবান্দ্রম, কন্যাকুমারী, বিবেকানন্দ রকটেম্পল, শ্রী পদ্মনাভস্বামী মন্দির, আত্তুকল ভাগবতী মন্দির, শ্রী পজ্বভাঙ্গাদী গনপতি মন্দির, নেপিয়ার মিউজিয়াম, পুভার দ্বীপ, কোভালাম সী বীচ, আজিমালা শিব মন্দির, ভিজিংজাম লাইট হাউজ, আগাস্তা মালা ইত্যাদি স্থানে ঘুরে দেখার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় অবশ্যই আমাদের কাছে বড়ই চিরস্মরণীয়, আনন্দদায়ক ও সুখদায়ক ছিল।
ত্রিবান্দ্রম থেকে আমরা সরাসরি কলিকাতায় ফিরে আমাদের ভারতভ্রমণ পর্ব শেষ করি।
কলিকাতায় ফিরে আসার পর, আমাদের হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার রেজাল্ট পর্ব, নতুন কলেজে নিউ এডমিশানের জন্য বিভিন্ন কম্পোটেটিভ পরীক্ষা পর্ব, বাস্তব জীবনের কঠিন লড়াই পর্ব শুরু হয়ে যায় এবং বাস্তব জীবনের কঠিন লড়াই এর প্রস্তুতি পর্বে ঐসব পুরাতন চিরস্মরণীয় স্মৃতি আমাদের জীবন থেকে আস্তে আস্তে বহু দুরে ফেলে আসতে বাধ্য হই।
একাদশ শ্রেণীর বোর্ডের পরীক্ষার পর আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা চালানোর জন্য আমাদের অঞ্চল থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের যাতায়াতের জন্য আমাকে ২+২ = ৪ ঘন্টা অধিক সময় ব্যয় করতে হতো।
কলেজ জীবনে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা আর চার জন ছেলে মেয়ে থেকে ভিন্ন ও বড়ই সুখদায়ক এবং আরামদায়ক ধরনের ছিল না।
কলেজের সপ্তাহে তিন দিন (প্রতি ১দিন অন্তর) থিওরী ক্লাসের সময় সকাল ১০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা। বাকি ৩ দিন ওয়ার্কসপ ক্লাস আরম্ভ হতো (ফ্যাক্ট্ররীর সময় অনুযায়ী) সকাল ৮ টা থেকে বিকাল ৫ টা।
যেই কয়েক দিন থিওরী ক্লাস সকাল ১০ থেকে আরম্ভ হতো, সেই কয়েক দিন আমার প্রাত্যহিক রুটিন ছিল ভোর ৫ টায় আরামের বিছানা ত্যাগ করে দৈহিক কসরত করে, সকাল ৫.৩০ টায় ছাত্রীর বাড়ি পৌঁছে ছাত্রীটিকে জোড়জোবস্তি ঘুম থেকে তুলে ঐ আধা ঘুমন্ত অবস্থায় ছাত্রীটিকে সকাল ৭.৩০ অবধি টিউশনি পড়িয়ে বাড়ি ফিরে ৮.১৫ টার মধ্যে স্নান, খাওয়া দাওয়া সেরে কলেজের উদ্দ্যেশে রওনা হয়ে ১০ টার মধ্যে কলেজে উপস্থিত হতে হতো।
বিকাল ৬ টায় কলেজ থেকে ছুটির পর রাত ৮ টার মধ্যে আমার বাসস্থানের নিকটবর্তী অন্য আরেকটি ছাত্রীর বাড়ি ফিরে রাত ৯.৩০ অবধি টিউশনি পড়াতাম।এই ছাত্রীটি ক্লাস এইটে পড়াশোনা করত। সদ্য সদ্য বিবাহিতা গ্রাম্য ঘোমটা ঢাকা বৌ।
ঐ ছাত্রীটি মাঝে মাঝে সংসারের বিভিন্ন কাজের কারণে সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আমার কাছে যখন টিউশনি পড়তো, সেই সময়ে অঙ্ক বোঝানোর সময় খেয়াল করতাম ছাত্রীটি ঘোমটার আড়ালে ঘুমিয়ে পড়েছে।
অগত্যা ছাত্রীটির ঘুম ভাঙ্গিয়ে ছাত্রীটিকে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল খাওয়ার নিদান দিয়ে সেদিনকার মতো ছাত্রীটিকে ছুটি ঘোষণা করে দিতাম।
বাড়ি ফিরে আমার খাওয়া দাওয়া শেষ করে রাত ১০ টা থেকে ১১.৩০ টা অবধি নিজের কলেজের পড়াশোনা শেষ করে বিছানায় পরিশ্রান্ত শরীর টাকে এলিয়ে দিতাম।
ক্লাস এইটের আর একটি ছাত্র খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল।
ছাত্রটির মামা ছিলেন অসীম জ্ঞানের ভান্ডার। কোনো কলেজের নতুন নতুন জুনিয়ার লেকচার পদে কর্মরত ছিলেন।
প্রানের ভাগিনাকে সর্ব বিষয়ে পারদর্শী করার জন্য প্রয়োজনের অধিক ভিন্ন বিষয়ক জ্ঞান তার মগজে ঠুসে ঠুসে ঢুকিয়ে দিতেন।
প্রানের ভাগিনার সাথে সময়ের অনুপযুক্ত বিষয়ে আলোচনা করে ভাগিনার জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধির আপ্রান চেষ্টা চালিয়ে যেতেন।
পরিনাম স্বরুপ আমার কলেজ ফেরৎ রাত ৮ টায় তার ক্লাসের পাঠ্য বিষয়ে টিউশনি আরম্ভ করার সংগে সংগে তার অভিভাবকদের উপস্থিতিতেই তার ক্লাসের পাঠ্য বিষয়ে ভিন্ন অন্য বিষয়ে অহেতুক জানার কৌতুহল মেটানোর জন্য আমাকে নিরন্তর প্রশ্নবানে জর্জরিত করার প্রয়াস আরম্ভ করে অযথা প্রাত্যহিক পঠনপাঠন এর ১ ঘন্টা সময় অপচয় করে সে যে অনেক কিছুই জানে তা প্রমান করার আপ্রান প্রচেস্টা চালিয়ে যেতে লাগলো।
এই ব্যাপারে তার উপস্থিত অভিভাবকগনরা ও সমান ভাবে তাকে উৎসাহ প্রদান করতে আরম্ভ করে দিতে লাগলেন।
তার বাবা আবার আমার বাবার বিশেষ পরিচিতি ছিলেন।অগত্যা কয়েক মাস টিউশনি পড়ানোর পরে আমার মনে হয়েছিল আমি অযথা সময় অপচয় করেছি মাত্র।
ঐ অবস্থায় আমি সেই ছাত্রটিকে টিউশনি না পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম এবং ছাত্রটির বাবাকে আমার সময়ের অভাবের অযুহাত দেখিয়ে সেই টিউশনিটি প্রত্যখান করতে বাধ্য হলাম।
ঐ সময়ে পরবর্তী আর একটি মজার ঘটনা উল্লেখ না করে পারছি না।
স্থানীয় এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাদের অবর্তমানে কিছু দিন সন্ধ্যার পর রুটি, সবজি, বই, খাতা, পেন বগলদাবা করে সেই কয়েক দিন পড়তে ও ঘুমোতে যেতাম।
একা একা ভুতের ভয় কাটানোর জন্য ঐ অঞ্চলের আর এক বন্ধুকে ও একসাথে আমার সাথে পড়াশোনার এবং ঘুমানোর জন্য সঙ্গী করেছিলাম।
দুইজনের কাছেই ঐ বাড়ির প্রধান দরজার ডুপ্লিকেট চাবি ছিল। নিজের নিজের প্রাইভেট টিউশনি শেষ করে যে আগে ফিরে আসতো, সেই আগে আগে চলে আসতাম ।
একদিন আমি অনেক আগে ফিরে প্রধান দরজার তালা খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে আবার পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে প্রধান দরজায় আবার তালা আটকে পেছনের দরজা দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে লুকিয়ে থাকলাম।
কিছুক্ষন পরে বন্ধুটি প্রধান দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকে এল।
আমি লুকিয়ে লুকিয়ে সবকিছু নজর রাখতে আরম্ভ করে দিলাম।
কিছুক্ষন বাদে আমি বিভিন্ন ধরনের ভৌতিক আওয়াজ করতে আরম্ভ করে দিলাম।
ঐ বাড়িটির সংলগ্ন আশেপাশে আর কোনো বাড়িঘর না থাকার কারণে বন্ধুটি প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিল এবং আস্তে আস্তে ভয় পেতে আরম্ভ করে দিয়েছিল।
অবস্থা বেগতিক দেখে আমি তার সামনে বেড়িয়ে এসে অবস্থা সামাল দিলাম।
কলকাতা শহরের নিকটবর্তী আমাদের পৈত্রিক বাসস্থানের অঞ্চলে তখন ২৫ - ৩০ টি পরিবারের বাসস্থান ছিল।শৈশবের ঐ সময়ে আমাদের পরিবারের দাদু, দিদা, ঠাকুর দাদা, ঠাকুর মা, বাবা, মা, মাসি, মেসো, মামা, মামি,পিসি, পিসাই,জ্যাঠা, জ্যাঠি, কাকা, কাকিমা, বড় দাদা, বৌদি,দিদি, বড় ভগ্নিপতি রা কেবলমাত্র আমাদের অভিভাবক ছিলেন না।
আমাদের অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারের বয়স্ক এবং বয়স্কা সদস্যরা ও আমাদের অভিভাবক ছিলেন। তাই কোনো রকম দুস্টুমি করার পূর্বে আমাদের ১০০০ বার চিন্তা করতে হতো।
আমাদের পৈত্রিক বাসস্থানের অঞ্চলে তখন ঐ ২৫ - ৩০ টি পরিবারের বাচ্চা থেকে বুড়ো সমস্ত সদস্যদের নিয়ে আমাদের একটা ভরা পরিবার ছিল।সরস্বতী পূজা, দোল উৎসব, বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্পোর্টস এ আমরা বাচ্চা বুড়ো দলবেঁধে সবকিছু অনুষ্ঠানে আমরা সবাই এক ই সংগে অংশগ্রহণ করতাম।
আমাদের প্রত্যেকটি পরিবারের অভিভাবকরা আমাদের পড়াশোনা ছাড়াও এই সব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আমাদের খুবই উৎসাহ দিতেন।আগে থেকে সভা করে সবার সন্মতিক্রমে ঐ ৩০ পরিবারের কোনো একটি গৃহে দোল উৎসব পালন করা হতো এবং প্রত্যেক বছর ভিন্ন ভিন্ন গৃহে তার পালন করা হতো।
দোলের সময় আমাদের ঐ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য ছিল দোলের দিন সকাল থেকে বাচ্চা বুড়ো, জ্যাঠা,বাবা, মামা, কাকা, সমস্ত বাচ্চা ছেলে মেয়ে, মা মাসিরা দোলের রং খেলায় মেতে উঠতেন এবং ঐ ধর্মীয় দোল উৎসবে অংশগ্রহণ করতেন। ঐ গৃহে এবং সংলগ্ন ময়দানে দোলের আগের দিন হরি নাম সংকীর্তন সহযোগে সন্ধ্যায় চাচ৺ড় ঘর পোড়ানো হতো ।
দোলের দিন ভোর ৪ টা থেকে রাত ৮ টা অবধি বিরামহীন হরির নাম সংকীর্তন চলতো।
সংকীর্তন শেষে ঐ ৩০ পরিবারের প্রায় ২০০ এবং আশেপাশের অঞ্চলের আরো ৫০ জন এক ই পরিবারের মতো আমাদের ঐ দোল উৎসবের সংকীর্তনে অংশ গ্রহণ করে একসাথে ৫০ থেকে ৬০ জন করে খালি ধু ধু বড় কোনো ঐ গৃহটির নিকটবর্তী মাঠে মাটিতে বসে খিচুড়ি ভোগ প্রসাদ গ্রহণ করতেন।
যদি ও বংশানুক্রমিক ভাবে এখনো ঐ দোলের উৎসব চলে আসছে। কিন্তু বর্তমানে ও নিয়মমাফিক ঐ উৎসব খুবই বড় আকারের পালন করা হয়ে থাকে।
সরস্বতী পূজা হোউক বা বাৎসরিক স্পোর্টস অনুষ্ঠান হোউক বা বাৎসরিক যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হোউক ঐ সময়ে আমরা সবাই এক ই পরিবারের মতো একসাথে অংশগ্রহণ করতাম।ঐ শৈশবকালে দেখা আমাদের অঞ্চলের রাস্তা ঘাট অতখানি উন্নত ছিল না।
বিশেষ করে বর্ষাকালে রাস্তা ঘাটের মান কিছু কিছু জায়গায় অব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতো।
বর্ষাকালের পর বয়সকে উপেক্ষা করে দাদু, জ্যঠা, বাবা, মামা, কাকা ও বড় দাদারা কোমড় বেঁধে রাস্তা ঘাট উন্নয়নের প্রয়োজন এ লেগে পড়তেন।
আমাদের অঞ্চলের কোনো পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে গৃহের অভিভাবকদের অনুপস্থিতিতে ও ঐ অঞ্চলের উপস্থিত কাকা, মামা, দাদারা অসুস্থ সদস্যকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারে সব সময় ঝাঁপিয়ে পড়তেন এবং পরবর্তী সময়ে ঐ গৃহের অভিভাবকদের খবর দেওয়া হতো। যা বর্তমান সময়ে কল্পনার অতীত।
আমরা যাহারা শৈশব থেকে এই বার্ধ্ক্য বয়সে জীবন যুদ্ধের প্রয়োজনে পৈত্রিক ভুমি ছেড়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে চলে এসেছি তারা মনে প্রানে জীবনের শেষ দিন অবধি ঐ সমস্ত অনুষ্ঠানগুলোকে এখনো তাদের স্মৃতীর চিলেকোঠায় সযত্নে পালন করে চলেছেন।
পারিবারিক প্রয়োজনে ভবিষ্যতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সেই সময় থেকে আমার আপ্রান প্রচেস্টা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল।
একাদশ শ্রেণীর বোর্ডের পরীক্ষার পর ভিন্ন শাখা নিয়ে ভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনার প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বহু দূরে বাবা, মা ভাইবোনদের থেকে ৫ বছরের জন্য বাড়ির বাইরে থাকতে বাধ্য হয়ে ছিলাম।
পড়াশোনার পরবর্তী অধ্যায় সমাপ্ত করে বাড়ি ফিরে আমার দ্বিতীয় প্রেমের দেবী মানে আমার মেমসাহেবকে আবার হারিয়ে ফেলি। আমার মেমসাহেবকে পরবর্তীকালে অনেক খোঁজাখুঁজি করে ও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নি।
আমাদের চার বছর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের সময় সীমা অনুযায়ী প্রতি বছরই ছয় মাস থিওরেটিকাল ক্লাসের সময় সীমা প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যে ছয়টা অবধি ক্লাস থাকত। আমার বাসস্থান থেকে আমার কলেজের যাতায়াত বাবদ অতিরিক্ত আরও দুই + দুই চার ঘন্টা অধিক সময় লাগতো এবং তার উপর রাত্রি নয়টা থেকে রাত একটা অবধি কলেজর প্রাত্যহিক পড়াশোনা করার জন্য সময় দিতে হতো,ফল স্বরূপ সকাল ছয়টা থেকে রাত্রি একটা অবধি প্রতিদিন এই ছয় মাস যাবৎ নিঃশ্বাস নেওয়ার ও ফেলার ঠিক মতো সময় পেতাম না, বন্ধুসঙ্গ তো দুর অস্ত।
একই অবস্থা হতো প্রতি বছরই ছয় মাস প্র্যাকটিকাল ক্লাসের সময় সীমা ও বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে (সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ছয় মাসের জন্য মাসিক পারিশ্রমিক বৃত্তির মূল্য প্রতি মাসে দেড়শত টাকা ধার্য করা থাকত) সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যে পাঁচটা অবধি। আমার বাসস্থান থেকে কোম্পানিগুলোর যাতায়াত বাবদ অতিরিক্ত আরও দুই থেকে তিন + দুই থেকে তিন = চার থেকে ছয় ঘন্টা অতিরিক্ত সময় লাগতো এবং তার উপর রাত্রি দশটা থেকে রাত একটা অবধি প্রাত্যহিক পড়াশোনা করার জন্য সময় দিতে হতো।
প্রয়োজনে এই যাতায়াত বাবদ অতিরিক্ত ছয় ঘন্টা সময় ও শারীরিক ধকল লাঘব করার এবং পড়াশোনা করার সময় বৃদ্ধি করার জন্য এই ছয়মাস বাড়ির বাইরেই পরিবারের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত ভিন্ন পরিবারের কাছে থাকার বন্দোব্যবস্থা করা হতো।
পারিশ্রমিক বৃত্তির মূল্য দেড়শত টাকা থেকেই কোম্পানি ও কলেজে যাতায়াত বাবদ খরচ, কলেজের বেতন, পুস্তকাদির খরচ, বাড়ির বাইরে থাকা খাওয়ার খরচ বহন করতে হতো।
ফ্যাক্টরিতে প্র্যাকটিকাল ট্রেনিং চলাকালীন ঐ বয়সে চোখের সামনে কিছু মানুষদের অ্যাকসিডেন্টে মেশিনের মধ্যে মৃত্যু হতেও দেখেছি।
সালটা ১৯৭৭, ইঞ্জিনিয়ারিং এর দ্বিতীয় বৎসর ছিল। ফুটবল সম্রাট পেলে নিউ ইর্য়কের কসমস টিমের হয়ে কলিকাতার মোহনবাগান টিমের সাথে ফুটবল খেলতে কলকাতা এসেছিল। টিকিট কেটে ফুটবল খেলা দেখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না । কেননা তখন আমার পকেটের ভাঁড়ার শূন্য। কিন্তু ফুটবল সম্রাট পেলেকে স্বচক্ষে দেখতে হবেই।
অগত্যা ঐ দিন অনেক কষ্টে তাড়াতাড়ি কলেজ থেকে ফিরে চটজলদি বিশেষ বন্ধুর সাথে সুপরামর্শ করে রাত নয়টার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে দেয়ে বন্ধুর বাড়ি পড়াশোনা করতে যাওয়ার নাম করে সোনারপুর থেকে ট্রেনে শিয়ালধহ ও ট্রেনে দমদম স্টেশনে চলে আসি ও দমদম স্টেশন থেকে বাসে দমদম বিমানবন্দরে রাত সাড়ে এগারোটায় পৌছে যাই।
ফুটবল সম্রাট পেলের বিশেষ বিমান রাত বারোটায় দমদম বিমানবন্দরে পৌছোনোর কথা। কিন্তু বিশেষ বিমান রাত দেড়টায় পৌছয়। পেলেকে স্বচক্ষে দেখে এবং তার অবোধ্য ভাষায় ভাষন (দ্বোভাষির মাধ্যমে ইংরেজিতে ভাষন শুনে) রাত দুইটা নাগাদ বিমানবন্দরের বাইরে বেড়িয়ে আসি। সমবেত জনতা সুস্ঠভাবে পরিকল্পনা করে পেলের জয়ধ্বনির সহিত ম্যটাডোরে করে বিমানবন্দরের অঞ্চল ত্যাগ করে ধীরে ধীরে বিদায় নিতে লাগলো ।
আর পরে রইলো আমার মতো কতিপয় হাভাতে, উৎকট, উদ্দেশ্য বিহীন জনতা।
গভীর রাত, বিমান বন্দরের শুনশান অঞ্চল, একটু আধটু ভয় পেতে আরম্ভ করে দিলাম। অগত্যা নিজেকে হিরো প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে বন্ধুকে সংগে নিয়ে প্রধান রাস্তার আলো ও বিমানবন্দরে অঞ্চলের সারারাত্রি ব্যাপী যাতায়াতকারী গাড়ি, যাত্রীদের উপস্থিতি,স্থানীয় পুলিশি সিকিউরিটি সিস্টেমের ওপর ভরসা করে পদব্রজে দমদম রেলওয়ে স্টেশন পৌছোনোর পরিকল্পনা করে হাঁটা আরম্ভ করে দিলাম।
এখানে ও বিধি বাম। গভীর রাত্রে অন্ধকারে দিক নির্দ্দেশ ভুল করে নাগেরবাজার থেকে দমদম রেলওয়ে স্টেশনের পরিবর্তে শ্যামবাজারের রাস্তা ধরে শ্যামবাজারের পাঁচ মাথার মোরে পৌছে গেলাম। অগত্যা পদব্রজেই সেই গভীর রাত্রে শ্যামবাজার হয়ে রাত সাড়ে তিনটের সময় শিয়ালধহ স্টেশনে পৌছে সোনারপুর ফেরার উদ্দেশ্যে শিয়ালধহ থেকে ভোরের সর্ব প্রথম খালি ট্রেনের সিটে বসে ঘুমিয়ে পরলাম। আর বন্ধুবর প্রাতকালিন কৃয়াকর্ম সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশনের টয়লেটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল এবং স্বাভাবিক কারনেই সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো।
ট্রেন ছাড়ার পর গড়িয়ার রেলওয়ে স্টেশনের প্রবেশের পূর্বে গড়িয়া রেলওয়ে ব্রীজের আওয়াজের জন্য আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল এবং সোনারপুর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতে ভোর প্রায় সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। কিছুক্ষন প্রভাতী কসরত করে বাড়ি ফিরে ভালো ছেলের মতো ঘুমিয়ে পরেছিলাম।
বন্ধুবর শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশনের টয়লেটে ঘুম থেকে উঠে আমাকে অনেক খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে ট্রেনে করে সোনারপুর পৌঁছে বাড়ি চলে যায়।
পরিবারের বাইরে পাথুরে মাটিতে বাস্তব অভিজ্ঞতা আরও বেদনাদায়ক।
পাস করে কোথাও (Without any reference ব্যতীত) কোনো চাকরির সুযোগ নেই। দিনের পর দিন উদ্দেশ্যেবিহীনভাবে খুদার্থ অবস্থায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, রাতের পর রাত চিন্তায় বিনিদ্র রজনী কাটানো, চোখের সামনে পাঁচ ( ইতিমধ্যে দিদিকে সেই সময়ে নার্সিং ট্রেনিং পাস করে ঐ হাসপাতালেই নার্স হিসাবে জয়েন করে থাকতে হয়েছিল) ভাইবোন সহ পারিবারিক খরচের চাপে বয়স্ক বাবার অসুস্থ শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ও বাবার মানসিক অস্থিরতা আমার মধ্যে ও প্রসারিত হতে লাগলো ।
এই বিপর্যয়গস্থ পরিস্থিতিতে বাবার একার নিম্ন পরিমাপের আয় ও দিদির অতি সামান্য নার্সিং এর পারিশ্রমিক বাবদ প্রাপ্য অতি সাধারণ অর্থ দ্বারা পুরা সংসারের খরচ সামলানো সত্যিই অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
সেই অবস্থায় ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স পাস করে উপযুক্ত চাকরি বাকরির অভাবে দিশাহারা। বাধ্য হয়ে অগত্যা জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে পরিবারের সদস্যদের অজ্ঞাতেই বাড়ি ছেড়ে ধানবাদের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলাম ও কর্মজীবনের প্রবেশের আপ্রাণ প্রচেষ্টা ও জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য নিজের কাছে নিজেই অঙ্গীকার করে নিলাম এবং কিছু না করে বাড়ি না ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম।
আমার কর্মজীবন শুরু হয় ভারত সরকারের অন্তর্গত ধানবাদের ভারত কোকিং কোল লিমিটেড কোম্পানির (বি সি সি এল) অন্তর্গত একটি ছোট্ট কোল ওয়াশারি মুনিডিহ থেকে।ঐখানে কলকাতার এক ইন্জিনিয়ারিং কনট্রাক্টরের অধীনে আমার কর্মজীবন শুরু।
কর্মজীবনে ধানবাদের ঐ ছোট্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিতে ফ্রী থাকা খাওয়া ও মাসিক পারিশ্রমিক মূল্য মাত্র আড়াইশো টাকার উপর নির্ভর করে নিযুক্ত হলাম এবং ছয়মাস পরে বাড়িতে ফিরে সঞ্চিত ছয় মাসের এককালীন পারিশ্রমিক মূল্য মায়ের হাতে তুলে দিয়ে আবার ধানবাদে ফিরে গেলাম।
দশ বারো জনের গঠিত টিমের (ইঞ্জিনিয়ার, কোম্পানির অফিস স্টাফ, স্টোর কিপার, লেবারের) জন্য থাকার ফ্রী ব্যবস্থা কোলকাতার কোম্পানির অস্থায়ী ক্যাম্প কোলিয়ারি কাম ওয়াশারির 3 রুম লেবার কোয়াটার। একটি মাত্র ওয়াশ কাম টয়লেট কাম বাথরুম। একটি ছোট্ট একজন সদস্যের নড়াচড়া করার উপযুক্ত রান্না ঘর, তিনটি ছোট্ট বেডরুম সহ লেবার কোয়াটার।
ওয়াশারির অপরিশোধিত টাইম-জলকল, রান্নার জন্য কোলিয়ারির ফ্রী কাঁচা কয়লা।
প্রাত্যহিক বারো ঘন্টা ডিউটি টাইম সকাল আট টা থেকে রাত আটটা।আমাদের কাজ ছিল ভারত কোকিং কোল লিমিটেডের বিভিন্ন কোলিয়ারি এবং ওয়াশারির জন্য পাওয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সাপ্লাই পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করা।
সেই উদ্দেশ্যে বিদেশ (জার্মান, গ্রেট ব্রিটেন, সুইডেন, রাশিয়ান ইত্যাদি বিভিন্ন দেশের বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন ৫.৫ মেগা ওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ডিজেল জেনারেটর) থেকে আনা ডিজেল জেনারেটর ইরেক্সান এবং কামিশানিং করা।
আমাদের সম্পূর্ণ কাজটি চারটি অংশে বিভক্ত ছিল। ১) সিভিল ওয়ার্ক ২) ম্যাকানিকাল ওয়ার্ক ৩) ইলেকট্রিকাল ওয়ার্ক ৪) কামিশানিং ওয়ার্ক।
ফল স্বরূপ প্রতিদিন ভোর সাড়ে চারটা থেকে বাথরুম দখলের রাম রাবনের লড়াই, স্বহস্তে ব্রেকফাস্ট তৈরি করা, লাঞ্চের ব্যবস্থা করা, ব্রেকফাস্ট খাওয়া দাওয়া করে সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে দুপুরের খাবার সমেত প্ল্যান্টে পৌছোনো।
রাত সাড়ে আটটায় কোয়াটারের ফিরে আবার রাতের রান্নাবান্নার তোড়জোড় , অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে বসে তাস খেলা, গান শুনে রাত সাড়ে দশটার মধ্যে ডিনার করে রাতে ঘুমানোর জন্য হাওড়া, শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশনের মতো পরিবেশে ভীম দুর্যোধনের মতো জায়গা দখলের লড়াই করে জায়গা দখল ও জয় করে রাত্রি যাপন করা। প্রাত্যহিক জীবনে সকাল থেকে রাত অবধি লড়াই করে দিন ব্যতীত হতো।
সাপ্তাহিক একটি ছুটির দিনে সাপ্তাহিক জমানো ক্রিয়াকর্ম যেমন সকালের নাস্তা করে, ঘরদোর পরিষ্কার করে, কাপড় চোপড় ধোয়া/পাকলা করে দিন শেষ হয়ে যেত। কখনো কখনো সব সদস্যরা দলবেঁধে কখনো নদীর পাড়ে বনভোজন করে, কখনো কোনো সাঁওতাল, মুন্ডা গ্রামে দলবেঁধে ভ্রমণ করে সময় কাটতো।
কখনো বা স্থানীয় গনপরিবহন ব্যবস্থা ট্রেকারে করে দূরবর্তী কোনো স্থানে পিকচার হলে পিকচার দেখতে যাওয়া (কোলিয়ারি গুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অতি সাধারণ লোকালয়, বড় বাজার, দোকান পাট, মার্কেট, স্কুল, বিনোদন পার্কের ব্যবস্থা থেকে অনেক অনেক দূরবর্তী, দুর্গম স্থানে অবস্থিত থাকতো) এবং পিকচার হল গুলো সপ্তাহে একদিনই ছুটির দিনেই চালু থাকতো। মার্কেটে দুপুরের লাঞ্চ সেরে অনেক সময়ে পিকচার হলে গিয়ে দেখা যেত আমরা ছাড়া আর কোনো দর্শক নেই, আমাদের অনেক কাকুতিমিনতি সহ নিবেদন ও প্রার্থনায় আর ও দুই দশজন স্থানীয় দর্শকদের উপস্থিতিতে বিহারি বা ভোজপুরি পিকচার চালু করা হত। পিকচার হলগুলো অধিক সময়ে একজন বা দুইজন স্থানীয় কোনো দোকানের মালিকের থাকতো। তারা দুইজন মিলে কখনো সিকিউরিটি গার্ড কাম টিকিট সেলিং স্টাফ কাম অপারেটর ডিউটি পালন করতো।পিকচার হলগুলোর ওপরের টিনের আচ্ছাদন , চারপাশের চটের বা বেড়ার দেওয়াল, দর্শক আসন থাকতো চটের বস্তা।
অবশ্যই ঐ সব পাবলিক স্থানে বিদুৎ সরবরাহ খুবই অপরিমিত সাপ্লাই থাকতো, কেরোসিন তেলে চলা জেনারেটরের বিকল্প ব্যবস্থা থাকতো। পিকচার হল গুলোর পিকচার দেখানোর টাইমিং বৈকাল তিনটে থেকে সন্ধ্যা ছয়টা অবধি থাকতো । পিকচার দেখে রাতের খাবার খেয়ে সব দল বেধে দশজন সিটের ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রেকারে কুড়িজন যাত্রী কোলে, পিঠে, কাঁধে, মাথায় চেপে হৈ হূল্লুর করতে করতে রাত্রি দশটার মধ্যে কোয়াটারে ফিরে পিকচারের বিভিন্ন অংশ নিয়ে আলোচনা করতে করতে ঘুমিয়ে পরতাম।
কোলিয়ারির লেবার কোয়াটারগুলো অসমান ছোট ছোট পাহাড়ের উপর আপার পট্টি, মিডল পট্টি, লোয়ার পট্টি নামে বিভক্ত করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দশ পনেরোটা কোয়াটারের নিয়ে ব্লক তৈরি হতো। তার দুই তিন মাইলের এরিয়ার বাইরে স্থানীয় ধারা, মুন্ডা, সাঁওতালদের গ্রাম ছিল, তারা সাধারণত কোলিয়ারিতে রিগার, কয়লা বওয়ার মুটে বা অন্যান্য দৈহিক পরিশ্রমের কাজে নিযুক্ত হতো।
শীতকালের পূর্ণিমার রাতের দৃশ্য অতুলনীয়, ধারা, মুন্ডা বা সাঁওতালদের গ্রামের বাচ্চা, বুড়ো, ছেলে, মেয়ে, মরদ, মহিলারা সারা রাত লোকাল পানীয় হাঁড়িয়া, মহুয়া ইত্যাদি পান করে মাদল বাজিয়ে নাচ গান করে তাদের দৈহিক পরিশ্রম লাঘব করতো।
আনন্দ, মস্তি করতো, আমরা রাতের খাবার খেয়ে কখনো কখনো এইসব ট্রাডিশনাল নাচ,গান দেখার জন্য স্থানীয় মুন্ডা, সাঁওতালদের সাহায্য নিয়ে উপস্থিত হতাম।
কখনো কখনো নিকটবর্তী অন্য কোলিয়ারিতে সারা রাত কলকাতার নামি,অনামি যাত্রাপার্টির আয়োজিত যাত্রাপালা দেখার জন্য লেবার অফিসারের কাছ থেকে ট্রাক বা ডাম্পার ব্যবস্থা করে দেখতে চলে যেতাম।
শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা একই একঘেয়েমি গতানুগতিক গতিতে রুটিনমাফিক জীবন চলতে লাগলো।
আমাদের কোম্পানির মালিক মাসে চার থেকে ছয় দিন কলকাতা থেকে সাইটে আসতেন।
কখনো ক্লায়েন্ট মিটিং এটেন্ডেন্ট করতে, কখনো বিল সাবমিসান করতে, কখনো প্যামেন্ট কালেকশন করতে, কখনো সাইটের কাজের টেকনিক্যাল ব্যাপারে আলোচনা করতে, কখনো ম্যটারিয়াল এবং কনজিমিউবেল পারচেজ ও অ্যারেন্জমেন্ট করতে, কখনো লেবার প্যামেন্ট করতে, সর্বোপরি লোকাল মাফিয়া দাদাদের মাসিক তোলা দিতে আসতেন।
কোলিয়ারির অপরিশোধিত জলের কারনে বহিরাগত স্টাফরা ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে আরম্ভ করল। কাজের এক একটা অংশ তৈরি হয়ে গেলে কিছু পুরাতন লেবার চলে যেতেন এবং পরবর্তী অংশের জন্য নতুন করে কিছু লেবার আসতেন।গতানুগতিক এই ভাবেই একটি প্রজেক্ট শেষ হতে হতে ডিজেল জেনারেটরের নাম্বার অনুযায়ী দুই থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতো।
ধানবাদ অঞ্চলের কুখ্যাত মাফিয়া ডনদের সমন্ধে ধারনা ধানবাদে বসবাসকারী বা ধানবাদে যাতায়াতকারীদের কাছে নতুন কিছুই না। এই সব নিদ্দিস্ট মাফিয়া ডনদের রাজত্ব নিদ্দিস্ট অঞ্চল ভিত্তিক স্থির ছিলো। এক একটি অঞ্চলে এই সব মাফিয়া ডনরা সেই অঞ্চলের রাজা। তাদের কথাই শেষ কথা।
এক একটি অঞ্চলে এক একজন মাফিয়া ডন রাজত্ব করিতেন। প্রত্যেকের নামে ৪০ থেকে ৫০ টি খুন জখম রাহাজানি ইত্যাদির ভুড়িভুড় পুলিশ কেশ সব সময় জড়িয়ে আছে। টাকা পয়সা কামানোর জন্য সব ধরনের জঘন্য কাজ করতে তারা অম সিদ্ধহস্ত। খুন জখম অঞ্চল দখল ইত্যাদি তাদের কাছে নতুন কিছু ই নয়। ধানবাদ অঞ্চলে যারাই কাজের প্রয়োজনে যাতায়াত করে তাদের সবাইকে একটা মাসোহারা দিত বাধ্য ছিল।
কোনো এক সময়ে ক্লায়েন্টর পেমেন্ট দেরী করে ক্লিয়ার হওয়ার কারণে কোম্পানির মালিক লোকাল মাফিয়া দাদাকে মাসিক তোলা দিতে দেরি করে।
ফলস্বরূপ তাদের গুন্ডা বাহিনী আমাকে রাতের অন্ধকারে নদীর পাড়ের জঙ্গলে তুলে নিয়ে যায় মার্ডার করার জন্য।
কেন না তাদের ধারণা হয়েছিল কোম্পানির মালিক তাদের মাসিক তোলা আমাকে দিয়ে গিয়েছেন, কিন্তু আমি মাফিয়া দাদার লোকাল লোকজনকে সেই টাকা দিয়ে দিইনি। সারা রাত কনকনে শীতের ঠান্ডার মধ্যে ঐ নিঝুম রাতে এবং লোকালয় থেকে পাঁচ মাইল দূরবর্তী নদীর পাড়ের জঙ্গলে দশ পনেরো জন গুন্ডাবাহিনীর দ্বারা কার্যত বন্দি হয়ে আমাকে থাকতে হয়েছিল। তারা সবাই পিস্তল, বন্দুক প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা সুসজ্জিত ছিল। সেই গভীর নির্জন জঙ্গল ঘেঁষা নদীর বালির চড়ায় কনকনে শীতের ঠান্ডার মধ্যে তাদের কাছে শত সহস্রবার অনেক কাকুতিমিনতি করে ও কোনো লাভ হলো না। সকালে সূর্যদেব ওঠার পর গুন্ডা বাহিনী পরিবেষ্টিত অবস্থায় আমাকে মাফিয়া দাদার কাছে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হল।
সকালে সারারাত অভুক্ত অবস্থায় প্রায় ৩ ঘন্টা কাটানোর পর মাফিয়া দাদার সামনে আমাকে উপস্থিত করানো হলো। মাফিয়া দাদাকে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে পুরো ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করার পর ওনার হয়তো আমার মতো বাচ্চা ছেলের প্রতি কিছুটা দয়াপরবশ হলেন।
আর ও ২ ঘন্টা পর উনি আমাকে কলকাতায় গিয়ে কোম্পানির মালিককে ৭২ ঘন্টার মধ্যে ওনার সামনে হাজির করানোর সমন জারি করে দিলেন এবং আমাকে ধানবাদ রেলওয়ে স্টেশনে ওনার দুইজন গুন্ডাবাহিনীর লোক সমেত একশত টাকা ও কলকাতা ফেরার ট্রেনের টিকিট সমেত ট্রেনে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।
হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে সোজা কোম্পানির মালিকের বাড়ি পৌঁছে ঘটনার সমস্ত বিবরণ জানিয়ে এক সপ্তাহের জন্য ছুটি নিয়ে নিলাম।
এক সপ্তাহের পর কোম্পানির মালিকের সাথে ধানবাদে পৌঁছে মাফিয়া দাদার সামনে উপস্থিত হয়ে সিচুয়েশন অনেক নর্মাল দেখলাম।
মালিক মাফিয়া দাদার সাথে মিটিং করে ঝামেলা মিটিয়ে ফেল্লেন।
সেই মাফিয়া দাদার কাছ থেকে অবশ্য পরবর্তীকালে যে কোনো প্রয়োজনে প্রচুর সাহায্য পেয়েছিলাম।
কিন্তু এখানে ও বিধি বাম ছিল, দেড় বছর পরে ধানবাদের কয়লা খাদানের (যেখানে আমাদের কাজ ও থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল) জল ভালো না হওয়াতে অ্যাকুট জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে কলকাতা ফিরে আসতে এবং কলকাতার হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হলাম।
তিন মাস পরে সুস্থ হয়ে ধানবাদে ফিরে গিয়ে ধানবাদের কাজকর্মকে চিরতরে বিদায় জানানোর জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করলাম এবং আর ও ছয় মাস পরে সেই সুযোগ ও হস্তগত করে ধানবাদের পাঠ চুকিয়ে কলকাতার নতুন নামী ইন্ডিয়ান/ বিদেশী কোলাবরেটেড কোম্পানিতে চাকুরিতে জয়েন্ট করলাম ।
আমার নতুন ইন্ডিয়ান বিদেশী সুইডিশ কোলাবরেটেড কোম্পানিতে, নতুন বস, নতুন ওয়ার্ক কালচার, নতুন কোম্পানির নতুন ধরনের প্রোডাক্টের ব্যাপারে প্রথম পরিচিত হতে কোমড় বেঁধে লেগে পরলাম।
প্রথম ছয় মাস চলে গেল নতুন কোম্পানির ওয়ার্ক কালচার, প্রোডাক্ট, কোম্পানির অ্যক্টিভিটি, কোম্পানির ফাংশান, আমার কাজের দ্বায়িত্ব, আমার ফাংশান ইত্যাদি বুঝতে বুঝতে।
"পাপি পেটের তাগিদে এবং কোম্পানির বিশেষ প্রয়োজনে বিবাহের পূর্বে আমাকে ভারতের আনাচে কানাচে সেই সময়ে প্রচুর ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। যেটা আমার প্রতি ভগবানের বরদান হিসাবে আমি কর্ম জীবনের সাথে এই ভারত ভ্রমণের সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলাম।"
১৯৮২ থেকে ১৯৯১ অবধি এই নয় বছর কোম্পানির প্রযেক্টের বিভিন্ন কাজের প্রয়োজনে ভারতবর্ষের অধিকাংশ রাজ্যে অধিকবার যাতায়াত করার সুযোগ হয়েছিল। সেই সময়ে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৩০০ দিনই কলিকাতার বাইরে থাকতে হয়েছিল এবং তার মধ্যে ১৫০ দিনই ট্রেনের সফরের সময় ব্যতীত হত।
এই সময়ে কিছু লোককে চোখের সামনেই প্রজেক্টের কাজের সময়ে বিভিন্ন ভাবে অ্যাকসিডেন্টে মারা যেতে দেখেছিলাম।
কখনো পা ফসকে ম্যাটারিয়াল স্টোরেজ জন্য নির্মিত ১০০০ টন বাঙ্কারে বা কখনো ১৪০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড গলিত ধাতুর টাবে বা কখনো চলন্ত মেশিনে বা কখনো বড় ট্রেলর থেকে মোটা মোট স্টিলের প্লেট নামানোর সময় বা কখনো কাজ চলাকালীন প্রোজেক্ট কন্সট্রাকশনের সময় ১২ তলা উঁচু ট্রান্সফার হাউস থেকে জমিতে পড়ে চিরতরে হারিয়ে যেতে দেখেছিলাম।
সেই সময়ে সকলের কপাল জোরে এবং উপরওয়ালার অসীম কৃপায় সেই বীভত্স দুর্ঘটনা থেকে আমরা সবাই রক্ষা পেয়েছিলাম।
এই সময়ে কাজের প্রয়োজনে সোনা, তামা, জিঙ্ক, এলুম্যনিয়াম, লোহা, কয়লা, চুনাপাথরের খাদান, প্রসেসিং প্ল্যান্ট, স্টিল প্ল্যান্ট, পাওয়ার প্ল্যান্ট, ধাতব মেল্টিং সপ, জল বন্দরে কাজের প্রয়োজনে যাওয়ার ও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সোনার পরিশোধন প্ল্যান্টে সোনার ইট, বিস্কুট, কয়েন সচক্ষে দেখার ও ছুঁয়ে দেখার সৌভাগ হয়েছিল।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের জনসাধারণের সাথে এই ভাবে মেলামেশার, বৈচিত্রময় ভারতের বিভিন্ন ভাষা, আহার, বাসস্থান, আদবকায়দা, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি, কালচার ইত্যাদির ব্যাপারে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগের পরিপূর্ণ রূপে সদ্ব্যবহার করতে সমর্থ হয়েছিলাম।
নতুন কোম্পানির প্রজেক্টের ইনস্টলেশনসের কাজে আমারই পুর্ব পরিচিত ধানবাদ অঞ্চলের পাথালডিহি কোলিয়ারিতে আমার সিনিয়র অফিসারের সাথে আমাকে সাতদিনের জন্য প্রথম টুরে পাঠানো হয়েছিল। ১০ দিন সময় সীমার মধ্যে নির্দিষ্ট কাজ শেষ করে ফেল্লাম।
কাজ শেষ করে নিকটবর্তী চাষনালার কোলিয়ারির দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কলকাতা অফিসে ফেরত্ এলাম।
এক বছর পূর্বেই নিকটবর্তী চাষনালা কোলিয়ারির মালিকপক্ষের দয়াতে এবং নির্দ্দেশে কয়লা উত্তোলন করার আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কয়লা খনন করবার সময়ে আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার রিজার্ভার এবং কয়লা খাদানের মধ্যবর্তী দেওয়াল ধসে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এই দুর্ঘটনাতে কোটি কোটি টাকার বিদেশী মেশিনারি সহিত কত শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়ারের যে প্রান গিয়েছিল তার সঠিক হিসাব পাওয়া দুষ্কর।কেননা প্রচুর কর্মরত ডেইলি ঠিকা শ্রমিক ও রিগারের নামের হিসাব মালিকপক্ষের নির্দ্দেশে ইচ্ছাকৃতভাবে লিখিত ভাবে রাখা হতো না।
পরবর্তীকালে চাষনালার সত্যি ঘটনা অবলম্বনে হিন্দি সিনেমা ও তৈরি হয়।
কলকাতার অফিসে দুই থেকে তিন দিন করে অফিস করে আবার কখনো সাত দিন, কখনো পাঁচ দিন, কখনো দশ দিনের জন্য ধানবাদ অঞ্চলের অন্যান্য কোলিয়ারি যেমন ডিবার্ডি, পুঁটকি, সাঁওতালডি, বরাকর, বোকারো স্টিল প্ল্যান্ট, চন্দ্রাপুরা থার্মল পাওয়ার প্ল্যান্ট, ভগনাথপুর, রাঁচি, ঘাটোটাং, ওয়েস্ট বোকারো ইত্যাদি অঞ্চলে চরকির মতো টুর করে বেড়াতে লাগলাম।
টিসকো ওয়েস্ট বোকারো কোলিয়ারির ঘাটোটাং এ একটা মজার ব্যাপার ঘটেছিলো।
রাঁচির রামগর অঞ্চল থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দুরত্বে ঘাটোটাং কোলিয়ারিতে কোম্পানির প্রয়োজনে ২৪ ঘন্টা দিন রাত কাজ চলেছিল।
টিসকো ওয়েস্ট বোকারো কর্তৃপক্ষ তিনটে সিফ্টে ২৪ ঘন্টা কাজের জন্য দশ থেকে বারোজন করে তিনটে লেবার গ্রুপের ব্যবস্থা করেছিল।
আমার কাজ ছিল প্রোপার প্ল্যানিং করে তিনটে সিফ্টের কাজে প্রতিটি সিফ্টে দুই থেকে তিন ঘন্টা করে কাজের সুপারভাইজ করা।
থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা কোম্পানির গেস্ট হাউজে বন্দোব্যবস্থা করা হয়েছিল।
আমার গেস্ট হাউজ থেকে কোলিয়ারির দুরত্ব প্রায় তিন থেকে চার মাইল, কোলিয়ারিরতে যাতায়াতের জন্য ২৪ ঘন্টা ড্রাইভার সমেত জিপগাড়ি আমার কাছেই থাকতো।
একদিন কোলিয়ারিতে নাইট সিফ্টে যাওয়ার জন্য জিপগাড়ির পরবর্তে মাইন্সের ডাম্পার ট্রাক হাজির।
অবাক হয়ে জানতে চাইলে জানতে পারলাম আসে পাসের প্রচুর পরিত্যক্ত মাইন্স থেকে আগের রাতে বাঘ বেড়িয়ে আমাদের মাইন্সের কয়েকজন শ্রমিককে আক্রমণ করে ছিল, তাই আমার সেফ্টটির কথা ভেবে কোম্পানির তরফ থেকে এই ব্যবস্থা।
টিস্কো ভগনাথপুরের ডলোমাইট মাইন্সে কাজের প্রয়োজনে যাওয়ার সময় আবার একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। কলকাতা অফিস থেকে আমার ভগনাথপুর ডলোমাইট মাইন্সে যাওয়ার প্রোগাম দেওয়া হল। ভোর চারটেতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাওড়া থেকে ট্রেনে করে ধানবাদ।তারপর ধানবাদ থেকে ট্রেকারে করে বোকারো।বোকারো থেকে ট্রেকারে করে চন্দ্রপুরা থার্মালপাওয়ার রেলওয়ে স্টেশন আবার বিকাল তিনটেয় পৌঁছে দেখলাম চন্দ্রাপুরা থার্মল পাওয়ার রেলওয়ের স্টেশন থেকে ভগনাথপুর যাওয়ার ট্রেন সারাদিনে একটি এবং তার সময় সকাল আটটায়।
ফলে সেই দিন ভগনাথপুরে যাওয়ার আর কোনো ট্রেন নাই।অথচ এই শীতের রাত্রে আসে পাসে থাকার কোনো হোটেলের ব্যবস্থা নেই।
চন্দ্রাপুরা থেকে ভগনাথপুরে যেতে ট্রেনে তিন ঘন্টা সময় লাগে। কুলি মজুরদের কাছে কথা বলে বলে জানতে পারলাম চারটের সময় একটা গুডস ট্রেন যাওয়ার সময় আছে।
তখনই ছুটলাম স্টেশন মাস্টারের সাথে কথা বলতে। কপালটা সত্যিই ভালো ছিল।
স্টেশন মাস্টার একজন বাঙালি ছিলেন।
আমার মামা "ঝড়িয়ার ভাগা রেলওয়ে স্টেশনের" স্টেশন মাস্টার ছিলেন, ওনার পরিচয় দিয়ে চন্দ্রাপুরের স্টেশন মাস্টারকে সব কথা বলে বোঝাতে উনি দুই তিনটি ফোন করলেন এবং একটি নোট প্যাড বানালেন, যাতে লেখা ছিল ওনার জরুরি ঔষধের জন্য ওনার শ্যালককে পাঠাচ্ছেন এবং লানইসম্যানকে দিয়ে লাল ঝান্ডা দ্বারা গুডস ট্রেন থামিয়ে আমাকে গুডস ট্রেনের গার্ডের বগিতে তুলে দিলেন এবং আমাকে ভগনাথপুর স্টেশনে নামানোর ব্যবস্থা করে দিলেন।
রাত্রি প্রায় সাড়ে সাতটায় নির্ভিগ্নে ভগনাথপুর স্টেশনে পৌছে টিস্কো কোম্পানির পাঠানো জীপগাড়িতে কোম্পানির গেস্ট হাউজ পৌছে গেলাম। ভগনাথপুরের কাজ শেষ করে ১০ দিন পর কলকাতায় ফিরে এলাম।
আর ও কিছু মাস পরে এক কনকনে ঠান্ডার মধ্যে এন এম ডি সির মেঘাতাবুরু আয়রন মাইন্সে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনজন কলিগসহ ভোর চারটের সময় হাওড়া স্টেশন থেকে জামশেদপুরে সকাল দশটায় পৌছে একটা জিপগাড়ি ভাড়া করে পাহাড়ী রাস্তায় এন এম ডি সির মেঘাতাবুরুতে বেলা একটায় পৌছে সারা দিন ওয়ারফুটিং বেসিসে মিটিং করে রাত সাতটায় ডিনার করে জামশেদপুরে রাত বারোটায় ট্রেন ধরার জন্য বেরিয়ে পরলাম।
আমাদের কপাল সত্যিই সোনা দিয়ে গড়া।
আমরা ৩ জন অফিস কলিগ রাতের ডিনার খেয়ে ড্রাইভার কে সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যা ৭.৩০ টা নাগাদ জিপগাড়ি স্টার্ট করে দিলাম।মেঘাতাবুরু থেকে জামশেদপুর পাকদণ্ডি ঢালু পাহাড়ি পথে সময় লাগে ২.৩০ থেকে ৩ ঘন্টা। টাটানগরে সহজেই রাত ১০ থেকে ১০.৩০ টায় পৌছে যাব। রাত ১১.৩০ তে টাটানগর থেকে হাওড়া ট্রেনে ফেরার কোনো সমস্যাই নেই। পাহাড়ী রাস্তায় জঙ্গলে এই পূর্নিমার নিস্তব্ধ গভীর রাতে চারদিকের শুনশান পাহাড়ী পাকদণ্ডি রাস্তার মনমোহিনী প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে ড্রাইভার ছাড়া আমাদের প্রত্যেকের মন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিলো। এই ভাবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম।জিপগাড়িতে নানা ধরনের আওয়াজ করতে করতে হঠাত্ জিপগাড়ির ইঞ্জিনে প্রবলেম দেখা দিল এবং গাড়ি বন্ধ হয়ে গেল। ড্রাইভার অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পরও ইঞ্জিন কিছুতেই স্টার্ট নিল না। এই গভীর রাতে পাহাড়ী শুনশান পাকদণ্ডি রাস্তায় কোনো ধরনের সাহায্যের আশা করা বৃথা।
আমাদের কপাল খুবই ভালো ছিল, আমরা পাহাড়ের ওপর থেকে ঢালু রাস্তায় নীচে নামার জন্য অগত্যা তিন বন্ধু মিলে জিপগাড়ি ঠেলতে ঠেলতে ভোর পাঁচটায় জামশেদপুর পৌছে সকাল ৬ টার ট্রেন ধরে কলকাতায় ফিরে আমাদের জঙ্গলি অভিযান শেষ করলাম।
কর্মজীবনে ১৯৮২ থেকে ১৯৯১ এই সুদীর্ঘ ৯ বছর একই ধরনের ঘটনার বারংবার পুনরাবৃত্তি হতে লাগলো।
মোটামুটি কোম্পানির কাজের প্রয়োজনে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে গড়পড়তা ৩০০ দিনই পরিবার, বাড়ি, আত্মীয়স্বজন, সামাজিকতা, বন্ধুবান্ধব, থেকে দুরে থাকতে বাধ্য হতাম। তার মধ্য ১০০ দিনই ট্রেনে সময় কাটাতে হতো।
সেই সময়ে হাওড়া থেকে দিল্লি, মুম্বই, মাদ্রাজ, গৌহাটি রুটের সমস্ত ট্রেনের সমস্ত কোচ টিকিট চেকারদের সাথে, রেলওয়ে ক্যাটারিং স্টাফদের সাথে, হাওড়া রেলওয়ে স্টেশনের টিকিট বুকিং স্টাফদের সাথে এমারজেন্সি চার ঘন্টা সময়ের মধ্যে অফিস টুরের প্রয়োজনে টিকিট রিজার্ভেশনের উদ্দেশ্যে টাকা পয়সা খরচ করে ভালোই সম্পর্ক তৈরি রাখতে হয়েছিলো। ফলস্বরূপ অফিসের টুরের প্রয়োজনে হাওড়া স্টেশন থেকে রিজার্ভেসনের না হওয়ার কারণে কখনোই ফেরৎ আসার প্রয়োজন হতো না।
ঝড়, বৃষ্টি, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, সামাজিক উৎসব, শরীর খারাপ কিছুতেই কাজের ছাড় ছিল না। মনে আছে অসুস্থ অবস্থায় ঔষধ খেয়ে এবং সংগে ঔষধ নিয়ে ট্রেনে উঠে টুরে বেড়তাম।
বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দূর্গাপূজা, কালীপূজা, স্বরসতীপূজা, ভাইফোটায়, নিকট আত্মীয়র বিয়ে বা অন্য কোনও অনুষ্ঠানে আমি অফিস টুরে কলকাতার বাইরে থাকাতে কোনো দিনই যোগ দেওয়ার সুযোগ হত না।
কেবলমাত্র পরিবারের নিজস্ব কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে কমপক্ষে তিন মাস আগে ছুটির অ্যাপলিকেসান করে সামাজিক অনুষ্ঠানের দ্বায়িত্ব পালন করার জন্য ছুটি নিতে বাধ্য হতাম, অবশ্যই এমারজেন্সি কোনো ঘটনার কারনে কোম্পানি মানবিক কারণে ছুটি মঞ্জুর করতে বাধ্য হতো ।
সেই অবস্থায় ও কিছু স্মরণীয় ঘটনার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছিলাম।
আমার ঠাকুরমা যখন মারা যান, সেই সময়ে আমি মাদ্রাজের নিকটবর্তী স্থানে মাদ্রাজ রাবার লাইনিং কোম্পানিতে কাজে নিযুক্ত ছিলাম। কোম্পানির ভেতরে দুইটি ক্যান্টিন ছিল, একটি কোম্পানির সাধারণ শ্রমিক, অস্থায়ী শ্রমিক, কনট্রাক্টর স্টাফ, কনট্রাক্টর শ্রমিক, সাপ্লায়ার প্রতিনিধিদের জন্য। অপরটি এসি সুবিধাযুক্ত, ধুলোবালি মুক্ত এক হাজার জনের বসার উপযুক্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশের উত্তম ব্যবস্থা। কোম্পানির এম ডি থেকে কোম্পানির স্থায়ী ম্যানেজমেন্ট ও স্থায়ী স্টাফ, গেস্ট প্রতিনিধিদের জন্য, বিরাট প্রায় আড়াই শত মিটারের লম্বা চলন্ত কনভেয়ার বেল্ট সহ প্রায় পঞ্চাশ রকম পদের সুখাদ্যের ব্যবস্থা থাকতো। খাবারের পদের মধ্যে স্যালাড, রাইতা থেকে বিভিন্ন নিরামিষ পদ সহ পাঁপড়, মিষ্টান্ন, আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিঙ্কস এর উত্তম ব্যবস্থা ছিল।
কোম্পানির কাছ থেকে এম আর এল কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট মাধ্যমে দুঃসংবাদের খবর পেয়ে মাদ্রজের কন্ট্রোলিং অফিসারকে কাজের ব্যপারে বুঝিয়ে দিয়ে মাদ্রাজ সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনে এসে দেখলাম কলিকাতায় ফেরার দুই ঘন্টার মধ্যে একটি ট্রেন আছে, কিন্তু ট্রেনের কোনো রিজার্ভেশন টিকিট নেই।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অথচ কলকাতায় ফিরতেই হবে। সেই দিন ঐ ট্রেন ছাড়া আর কোনো ট্রেনই নেই।
অগত্যা ট্রেনের সাধারণ দূরপাল্লার রেলওয়ে ট্রেনের টিকিট কেটে সংগের লাগেজ নিয়ে ঐ ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে এসে ঘোরাফেরা করার সময় হঠাত্ ই একটি পরিচিতি মুখ দেখতে পেলাম।
উনি ছিলেন ইস্টবেঙ্গল টিমের মাঠ রক্ষনাবেক্ষন করার স্টাফ শঙ্কর মালি। ইস্টবেঙ্গলের টিম মাদ্রাজের কোনো এক ফুটবল টুর্নামেনট খেলে পুরো টিম রেলওয়ের পুরো একটা কোচ বুক করে কলকাতায় ফিরছিল।শঙ্কর মালিকে পুরো ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা দিয়ে আমার কলকাতা ফেরা জরুরি বলে বোঝাতে সমর্থ হয়েছিলাম। উনি আমাকে ইস্টবেঙ্গল টিমের ম্যানেজার মিঃ সুধীর মজুমদারের সাথে কথা বলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। মিঃ মজুমদারকে কোম্পানির পাঠানো টেলেক্স দেখিয়ে সবিস্তারে বোঝানোর পর উনি ঐ কোচেরই ওনার বার্থের নিকটবর্তী একটি বার্থে আমাকে বসতে বল্লেন। মাদ্রাজ থেকে হাওড়া অবধি এই লম্বা জার্নিতে ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল প্লেয়ারদের সাথে হৈ হূল্লুর এবং গল্প গুজব করে সময় আনন্দদায়ক জার্নি ভালোই উপভোগ করেছিলাম।ট্রেন জার্নির এই সুদীর্ঘ সময় মিঃ মজুমদার আমার খাওয়ার পুরো ব্যবস্থাই করেছিলেন। কলকাতা ফিরে সময় মতো ঠাকুরমার ক্রিয়াকর্মের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করে পারিবারিক ক্রিয়াকর্ম করার সুযোগ হয়েছিল।
এইভাবে কখনো বিহার, মধ্য প্রদেশ, ওড়িষা, জামশেদপুর, মেঘাতাবুরু,কিরিবুরু, নোয়ামুন্ডী,
বড় জামদা, বোলানি, বরবিল, চাইবাসা অঞ্চলের বিভিন্ন আয়রন, কোল, চুনা পাথর, ডলোমাইট মাইন্স, জামশেদপুর স্টিল প্ল্যান্ট, ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট, রাউরকেল্লা স্টিল প্ল্যান্ট, বোকারো স্টিল প্ল্যান্ট, দূর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট, প্রতিটি জায়গায় ক্যারামের ঘুটির মতো দৌরে বেরাতে লাগলাম।
এর মধ্যে কোনো এক সময়ে নোয়ামুন্ডীর প্যালেট প্ল্যান্ট, ওয়াসারি, মাইন্স এর কাজে নোয়ামুন্ডীতে প্রায় দুই মাস টুরে থাকতে হয়েছিল।
একদিন শীতকালের রাত্রে প্ল্যান্টের কাজ শেষ করতে করতে রাত্রি আটটার সময়ে গেস্ট হাউজ ফেরার জন্য জিপগাড়ির খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম মাইন্সের অতি প্রয়োজনীয় কাজের জন্য আমারই অফিসের কাজে ব্যবহৃত জীপ গাড়িটিকে জামশেদপুরে পাঠানো হয়েছে এবং অন্য জীপ গাড়ি ব্যবস্থা করতে এক ঘন্টার বেশি সময় লাগবে।
প্ল্যান্ট থেকে গেস্টহাউসের দুরত্ব প্রায় দুই মাইল। অগত্যা পদব্রজেই গেস্ট হাউজ ফেরার জন্য প্ল্যান্ট থেকে বেড়োবার মুহূর্তে সিকিউরিটি অফিসার আমাকে আটকে দিলেন।
ঐ সময়ে জঙ্গলি ভালুকের দল মহূয়া ফল খেতে বের হয়।একাকি ঐ জঙ্গলের ঘুটঘুটে অন্ধকার পাহাড়ি রাস্তায় সিকিউরিটি অফিসার তাই আমার সংগে দশ বারো জন স্থানীয় শ্রমিকদের গোটা ছয়েক মশাল দিয়ে আমাকে গেস্টহাউসে পৌছোনোর ব্যবস্থা করে দিলেন।
প্রায় দুই মাস পরে কাজ শেষ করে আমি কলকাতায় ফিরে এলাম।
৩১ শে অক্টোবর ১৯৮৪ তে ইন্দিরা গান্ধীকে তারই বডিগার্ড সাতবান সিং এবং বিয়াত সিং ইন্দিরা গান্ধীর সফদরজঙ্গ, নিউ দিল্লির বাসস্থান বাংলো কাম অফিসে যাওয়ার রাস্তায় সকাল সাড়ে নয়টায় গুলি করে হত্যা করে।
বেলা তিনটা নাগাদ মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি এবং পাঞ্জাবীদের ওপর জনগণের অহেতুক হিংসাত্মক আক্রমণের প্রতখ্যদর্শী জনগণের মধ্যে আমি ও একজন।
আমি তখন কোম্পানির কাজে উত্তর প্রদেশের শক্তিনগরের জয়ন্ত কোল হ্যান্ডলিং প্ল্যান্ট এ কর্মরত ছিলাম।
জনগণ স্থানীয় গুরুদ্বার গুলোর ওপর আক্রমণ ও ভাঙচুর ও আগুন লাগানো আরম্ভ করে দিয়েছিল। তত্ক্ষণাত্ স্থানীয় বাজার দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল।
আমরা যারা বহিরাগত তাদের খাওয়া দাওয়ার সমস্যা অনির্দিষ্ট কালের জন্য তৈরি হয়ে গেল। স্থানীয় দুই চারজন সহৃদয় জনগণের সহায়তায় সেই যাত্রা বেঁচে যাই।
১৯৮৭ তে দিল্লিতে থাকাকালীন ইন্দিরা গান্ধীর সেই কুখ্যাত ঘটনার কাচের মোড়কে ঢাকা স্থল পরিদর্শন করার সুযোগ পাই।
স্থানটি মিসেস গান্ধীর বাংলোর মধ্যে একই কম্পাউন্ডের সীমার মধ্যে তার ড্রইংরুম থেকে অফিসের চেম্বারে যাওয়ার সুন্দর বাগানের পেডাস্টারীয়ান পথেই ঘটেছিল।
সাতবান সিংকে ঘটনাস্থলেই গুলি করে মারা হয় বিয়াত সিং কে পরে ফাঁসি দেওয়া হয় এক নম্বর সফর দং রোডে।
একইভাবে প্রায় ৪ মাস রাজস্থানের হিন্দুস্তান জিঙ্ক লিমিটেডের জহর মাইন্সে জিঙ্ক ওর ক্যলামাইন প্রসেসিং প্ল্যান্ট, উদয়পুর জিঙ্ক স্মেলটিং সপের কোম্পানির কাজের প্রয়োজনে যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল এবং সেই সুযোগে অবসর সময়ে স্থানীয় কোম্পানির অফিসারদের সাথে লোকাল রাজস্থানীয় নৃত্যকলা এবং আনুষঙ্গিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ঝলক উপভোগ করার সুযোগ পরিপূর্নরূপে সদ্ব্যবহার করেছিলাম।
এই প্রসঙ্গে আমার সঙ্গে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যার বিবরণটা উল্লেখ করা প্রয়োজন।
কাজের ভীষণ চাপে একবার এমন একটি অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যে আগাম পরিকল্পনা করা আমার প্রিয় জাতীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনন্দ ও হৈ হুল্লোর মাঠে মারা যাওয়ার উপক্রম হয় ।
দিল্লির একটি কাজ শেষ হতে হতে ষষ্ঠী চলে আসে। দুর্গাপুজোয় কলিকাতার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আগে থেকেই এক বছর ধরে পরিকল্পনা করা সমস্ত কিছু বানচাল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। দুর্গাপূজার ঠিক আগেই দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরার সমস্ত ট্রেনে নোরুম হয়ে যায়।
ফেরার কোনো রিজার্ভেশন টিকিট পাওয়া গেল না, অথচ কলকাতায় ফেরা ও ভীষণ জরুরী ছিল। ট্রেনে সারা বছর ট্রাভেল করার কারণে প্রধান প্রধান ট্রেনের এসি, ফার্স্ট ক্লাস, স্লিপার ক্লাসের এটেন্ডেন্টদের সাথে পরিচয় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তাদের সাহায্য পাওয়া যেত।
দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরার একটা জেনারেল টিকিট কেটে তাদের একজনের সাহায্যে দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরার কালকা মেলে সেই বন্ধুটির কোচে এলাহাবাদ কোটায় দিল্লি থেকে এলাহাবাদ অবধি একটা রিজার্ভ বার্থের ব্যবস্থা করা গেল, এবং এলাহাবাদ থেকে হাওড়ার ফেরার বার্থের পাওয়ার ব্যাপারে তার কাছ থেকে বিশেষ আশা ও ভরসা পাওয়া গেল।
কিন্তু বাস্তবে ঐ ট্রেনে ঐ সময়ে প্রচন্ড ভিড় হওয়ায় কারণে তা সম্ভব না হওয়াতে আমাকে প্রায় ২৪ ঘন্টা বেডরোল রাখার স্টোরেজ চেম্বার ঢুকে রেল পুলিশ এবং টিকিট চেকারের চোখে ধুলো দিয়ে কলকাতা ফিরতে বাধ্য হয়েছিলাম।
সেই সময়ে উদয়পুর প্যালেস, উদয়পুর সিটি, উদয়পুর লেক, জয়পুরের হাওয়া মহল, যোধপুর পিঙ্ক সিটি , চিতোড়গড়ের বিভিন্ন অগুন্তি গড় বা দুর্গ মহল ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান দর্শন করার সৌভাগ লাভ হয়েছিল।
একইভাবে ইন্দিরা গান্ধী থার্মাল পাওয়ার স্টেশন, বিন্ধাচল থার্মাল পাওয়ার স্টেশন, শক্তিনগর থার্মাল পাওয়ার স্টেশন, খাপারখেডা থার্মাল পাওয়ার স্টেশন,আনপাড়া থার্মাল পাওয়ার স্টেশন, ফিরোজ গান্ধী থার্মাল পাওয়ার স্টেশন, রেনুকুট রেনুসাগর থার্মাল পাওয়ার স্টেশন, টিস্কো জামশেদপুর স্টিল প্ল্যান্টের ব্লাস্ট ফার্নেস ক্যাপিটল রিপায়ারিং এর প্রয়োজনে, স্টিল অথোরিটি অফ ইন্ডিয়ার বোকারো স্টিল প্ল্যান্ট, রাউরকেল্লা স্টিল প্ল্যান্ট, ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট, বিশাখাপত্তনম স্টিল প্ল্যান্ট, দূর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট, বিভিন্ন ইস্টার্ন, ওয়েস্টার্ন, নর্দান কোল মাইন্স, আয়রন মাইন্স, কপার মাইন্স ইত্যাদি স্থানে কোম্পানির প্রয়োজনে প্রচুর ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।
কাজের মাঝে মাঝে ছুটির দিনে জামশেদপুরের জুবিলি পার্ক, ডিমনা লেক, চন্ডী ড্যাম, দলমা পর্বত ইত্যাদি স্থানে ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
এরই মধ্যে আমরা জামশেদপুরে এক মজাদার ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলাম। ঘটনাটির সঠিক সময়কালের তারিখ মাস বছর এই সময়ের স্মরণ শক্তির ভান্ডার হাতরে পাঠকজনের সামনে ঠিকমতো উপস্থাপন করা সম্ভব হল না বলে দুঃখিত। তবে ঘটনা টা ঘটেছিল আমাদের কোনো এক দূর্গা পূজার সময়। আর ও দুইজন অফিসের কলিগ সাথে তখন টা টা স্টিলের ব্লাস্ট ফার্নেস অ্যানুয়াল ক্যাপিটল রিপায়ারিং এর কারনে আমাদের তিনজনের পোস্টিং ছিল টাটানগরে। টাটা স্টিল কোম্পানির ভেতর দূর্গা পূজার সময় কাজ হয়। আমরা তিন বন্ধু টাটানগর শহরের দূর্গা পূজা দেখার জন্য সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর দিন ছুটি করে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতাম।
অষ্টমীর দিন দূর্গা ঠাকুর দেখে আমরা তিন বন্ধু বিকেল নাগাদ টাটানগরের বিখ্যাত টাটানগর রেলওয়ে স্টেশনের পাশেই গোল পাহারি মন্দিরে মায়ের দর্শন করার উদ্দেশ্যে অপ্রশস্ত সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা আরম্ভ করে দিলাম।
পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে দেখলাম সেখানে মায়ের মূর্তি একটি ছোট অন্ধকার মন্দিরে একটা জলন্ত মোমবাতির সামনের আসনের ওপর রাখা আছে। মন্দিরের সামনের খোলা আকাশের নিচে এক জটাধারী সাধুবাবা গাঁজায় টান মারছেন।
সেখানে সেই সন্ধ্যার সময়ে আমরা তিন বন্ধু ছাড়া আর কেউ ছিল না। মন্দির থেকে মায়ের দর্শন সেরে বের হয়ে আসার পর আমাদেরই এক বন্ধু আগ্রহ নিবারন করার জন্য সাধুবাবার সাথে আলাপ করা আরম্ভ করে দিল এবং আলাপচারিতার মাঝখানে বাবার প্রসাদ স্বরূপ বাবার গাঁজার কলকে নিয়ে টান মারা আরম্ভ করে দিল।
বন্ধুবর তিনবার সাধুবাবার নির্ভেজাল গাঁজার টান মারার পর মার্গদর্শন পর্যায়ে উপনীত হল।
আমরা বাকি দুই বন্ধু প্রথম বন্ধুর পীড়াপীড়িতে এবং কৌতুহল নিবারনের জন্য সাধুবাবাজীর প্রসাদ একটান করে আমাদের অনিচ্ছা সত্বে ও গাঁজার টান মেরে দিয়ে নিজেকে ধন্য এবং হালকা ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে ঐ মন্দির প্রাঙ্গণ ত্যাগ করলাম।
ইতিমধ্যে চারদিকে সন্ধ্যার কালো অন্ধকার আমাদের ঘিরে ফেল্লো। পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচে নামার অপ্রশস্ত সিঁড়িতে কোনো লাইটের ব্যবস্থা ছিল না। পাহাড়ের চূড়া থেকে লোকালয়ে নেমে আসার জন্য আমরা সত্যিই দুভিদায় পড়ে গেলাম।
প্রথমত - পাহাড়ের চূড়া থেকে নিচের লোকালয়ে নেমে আসা, দ্বিতীয়ত - অপ্রশস্ত ২০০ সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আসা, তৃতীয়ত - সম্পূর্ণ যাত্রাপথ নিস্তব্ধ ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তা , চতুর্থত - আমরা তিন বন্ধু ছাড়া অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তির অনুপস্থিতি, পঞ্চমত - আমরা তিন বন্ধুই বিশুদ্ধ গাঁজার প্রসাদে বুঁদ হয়ে ছিলাম।
শেষ পর্যন্ত আমরা আধঘন্টার সিঁড়িভাঙা পথ বসে বসে দুই ঘন্টায় অতিক্রম করে রাত দশটায় সশরীরে আমাদের হোটেলে ফিরে এলাম।
কিছু দিন পর জামশেদপুরের কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলাম।
কলকাতায় পাঁচ দিন থাকার পর পাইরাইটিস এন্ড ফসফেটস করপোরেশন লিমিটেড (পিপিসিএল) নতুন প্রোজেক্টের কাজে মিঃ ডিক্রজের সাথে আমাদের দেহেরি-অন-সনে ২ বছরের জন্য পোস্টিং করা হয়।
পিপিসিএল সাইট ডেহেরি-অন-সন টাউন থেকে ৬০ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত ছিল।
টাউন থেকে সাইটের গনপরিবহন ব্যবস্থা খুবই খারাপ ছিল।
প্রতি ঘন্টায় একটি মাত্র বাসের পরিষেবা ছিল।
টাউন থেকে সাইটে পৌছতে ২ ঘন্টা সময় লাগতো। প্রথমে আমরা টাউনে হোটেলে উঠেছিলাম। পরবর্তীকালে কাজের সুবিধার জন্য পিপিসিএল গেস্ট হাউসে স্থানানত্বরিত হলাম। পিপিসিএল সাইট টি একটি পর্বতের পাদদেশে পান্ডববর্জিত গ্রামে অবস্থিত ছিল।
আমাদের কাজ ভালোই চলছিল, কিন্তু পিপিসিএল সাইটের যোগাযোগ ব্যবস্থার অত্যন্ত করুন অবস্থার কারণে আমাদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার কলকাতার অফিসে ট্রাঙ্ক কলের মাধ্যমে রিপোর্ট করার জন্য টাউনে আসার প্রয়োজন হতো। একবার পিপিসিএল সাইটে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমি আর মিঃ ডিক্রজ টিফিন লাঞ্চের সময় প্রোজেক্ট সাইটের অস্থায়ী ক্যান্টিনে খাবার খাওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছিলাম। মিঃ ডিক্রজ খুবই স্মার্ট এবং হৈ হূল্লুর প্রকৃতির যুবক ছিল।
আমরা কাজের একঘেয়েমি কাটানোর জন্য উভয়ই উভয়ের সাথে খুবই মজা করতাম।
মিঃ ডিক্রজ তার কালো গগল্স টা খাবার টেবিলে রেখে হাত মুখ ধোওয়ার জন্য ওয়াস রুমে গিয়েছিল। একটা স্থানীয় রোডসাইড কুকুর খাবার আশায় প্রতিদিন সেইখানে উপস্থিত হতো এবং আমরা ও কুকুরটাকে ভালোবেশে উভয়েই কুকুরটিকে খাবার খাওয়াতাম। আমি বদমাশী করে মিঃ ডিক্রজের কালো গগল্স টা কুকুরটিকে পড়িয়ে দিলাম এবং কুকুরটি ও স্মার্টলি গগল্সটা পড়ে স্থানীয় মার্কেটে ঘুরে বেড়াতে লাগল, আর বেচারা মিঃ ডিক্রজ কুকুরটির পেছনে পেছনে ছুটতে আরম্ভ করে দিল। অগত্যা কুকুরটিকে ধরে গগল্সটি হস্তগত করে মিঃ ডিক্রজকে ফিরিয়ে দিলাম।
এরই মধ্যে দেহেরি-অন-সোন পি পি সি এল এ কাজ চলাকালীন আমার পিতৃবিয়োগ হয়।
কর্ম স্থল থেকে সিটি প্রায় ৬০ কিলোমিটার দুরত্বে অবস্থিত ছিলো। বাই কো-ইনসিডেন্স সিটিতে কলকাতা অফিসে ফোনে রিপোর্টিং এর জন্যে তখনকার সময়ে ট্রাংক কল বুকিং এর জন্য ডেহেরি-অন-সন শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জের থেকে কথা বলার সুযোগের অপেক্ষায় ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাঙ্ক কল বুক করে অপেক্ষা করার প্রয়োজন হতো।কলকাতার অফিসের মাধ্যমে পিতৃবিয়োগের কথা জানতে পেরে তৎক্ষনাত দেহেরি-অন-সোন টাউন থেকে পি পি সি এল প্রোজেক্ট সাইটে গিয়ে মিঃ ডিক্রজ কে সব কিছুই বুঝিয়ে ডিউটি হ্যন্ড ওভার করে তৎক্ষনাত কলকাতার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম।
কলকাতায় পিতৃবিয়োগের আচার অনুষ্ঠান শেষ করে আবার ডেহেরি-অন-সনে ফিরে গিয়ে পিপিসিএল সাইটের প্রোজেক্টের কাজ শেষ করে ২ বছর পরে কলকাতায় ফিরে এলাম।
কিছু দিন পর আবার নতুন প্রজেক্টের কাজে শক্তিনগর থার্মাল পাওয়ার স্টেশন (উত্তর প্রদেশ) এবং বিন্ধাচল থার্মাল পাওয়ার স্টেশন (মধ্যপ্রদেশ) যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল।
শক্তিনগর এবং বিন্ধাচল পাশাপাশি দুইটি অঞ্চল হওয়ার জন্য দুই রাজ্যের কাঁটা তারের বর্ডার পদব্রজেই অতিক্রম করে যাতায়াত করার প্রয়োজন হতো।
বিন্ধাচলে কাজ করার সময় এন টি পি সি বিন্ধাচল থার্মাল পাওয়ার স্টেশনের গেস্ট হাউসে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং সাপ্তাহিক হাট থেকে জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য আমাকে শক্তিনগরে কাঁটা তারের আন্তঃরাজ্য বর্ডারের বেড়া টপকে হেঁটে যাতায়াত করার প্রয়োজন হয়েছিল। শক্তিনগর এবং বিন্ধাচলের কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলাম।
হিন্দুস্তান কপার লিমিটেডের (এইচ সি এল) মালঞ্চখন্দ কপার মাইন্সের নতুন প্রজেক্টের কাজে আবার আমাকে মালঞ্চখন্দে ডেপুটেশনে পোস্টিং করা হয়।
হাওড়া থেকে ট্রেনে মধ্যপ্রদেশের দূর্গ এবং দূর্গ থেকে ৭ ঘন্টা বাসে করে মালঞ্চখন্দ পৌছলাম।
হিন্দুস্তান কপার লিমিটেডের মধ্যপ্রদেশের গোন্ডিয়া ড্রিস্টিকে অবস্থিত মালঞ্চখন্দ কপার মাইন্সের কপার ওর চালকোপাইরাইট্স প্রসেসিং প্ল্যান্টের ইরেক্সানের সময় আমাদের ৩ জন ইন্জিনীয়ারদের চোখের সামনেই প্ল্যান্ট কমিশনের সময় ১০,০০০ টন স্টোরেজ ক্ষমতা সম্পন্ন "র ম্যাটারিয়াল" স্টোরেজ বাঙ্কারের ভিতরে অন্য আর এক কোম্পানির একজন ইঞ্জিনিয়ারকে পড়ে যেতে দেখেছিলাম এবং মাইন্সের ম্যাটারিয়াল তার ওপর চাপা পড়ে তার মৃত্যু হতেও দেখেছিলাম।
মালঞ্চখন্দ শুধুমাত্র খাদান এলাকা হওয়াতে স্থানীয় অধিবাসীরা সবাই গরিবসম্প্রদায় ভুক্ত ছিল, যাদের দিনে একবেলার খাবার জোগাড় করা ও খুবই কস্টদায়ক ব্যাপার ছিলো কিন্তু হিন্দুস্তান কপার লিমিটেডের খাদানের কাজ আরম্ভ হওয়াতে তাদের কিছু লোকের দুইবেলায় দুমুঠো অন্ন জোগাড় করার সংস্থান পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
ঐ খাদান এলাকায় মনোরঞ্জনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই মাঝে মাঝে কোনো ছুটির দিন দেখে আমরা চার বন্ধু মালঞ্চখন্দ গেস্ট হাউজ থেকে লাঞ্চের পর গোন্ডিয়া টাউনে এসে চাটাই দিয়ে ঘেরা চটের মেঝেতে বসে কেরোসিন তেলে চালানো জেনারেটরের সাহায্যে শুধুমাত্র চার বন্ধুই গ্রাম্য পরিবেশে মুভি দেখে, ডিনার করে রাত দশটায় গেস্ট হাউসে ফিরে আসতাম।
মালঞ্চখন্দের কাজ শেষ করার পর দূর্গ থেকে ৮ ঘন্টার সারারাত ব্যাপী বাসে জার্নি করে রায়পুর বস্তার ড্রিস্টিকে ,এন এম ডি সি বাইলাডিলা অঞ্চলের আয়রন প্রসেসিং প্ল্যান্টে অফিসের কাজের প্রয়োজনে ভিজিট করতে হয়েছিল।
সেখানে জার্মানি প্রযুক্তি দ্বারা পাহাড়ের গুহাকেটে পাঁচ কিলোমিটারের ও বেশি লম্বাযুক্ত সুরঙ্গ বানিয়ে চলমান কনভেয়ার বেল্টের প্রয়োগ দেখেছি। সেই সময়ে টানেল বোড়িং মেশিনের (টিবিএম) নাম কেহই ভারতে দেখেনি বা কানে ও শোনেন নি।
সেখানেই সপ্তাহে একদিনের লোকাল হাটে অসভ্য জঙ্গলি আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারী, পুরুষদের অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় জিনিসপত্র কেনাবেচার তাগিদে গভীর জঙ্গল ছেড়ে বাইরের সভ্য সমাজের লোকালয়ে আসার প্রয়োজন হতো।
স্থানীয় সূত্র মারফত জানতে পেরে ছিলাম এই জঙ্গলি আদিবাসীরা গভীর জঙ্গলে সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় থাকে এবং সভ্য সমাজে আসার সময় নিজেদের সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য চিরসাথী বিষ মাখানো তীর ধনুক তাদের সঙ্গী হিসেবে নিয়ে আসতো। এই সব জঙ্গলি আদিবাসীরা আগুনের ব্যবহার সমন্ধে পুরোপুরি অনভিজ্ঞ ছিল, তারা কাঁচা শাক সবজি, কাঁচা জঙ্গলি জানোয়ারদের মেরে খেতে অভ্যস্ত ছিল, গভীর জঙ্গলে তাদের টোলের আসেপাসে কোনো সভ্য সমাজের মানুষজন তখন অবধি পৌছোনোর কথা চিন্তা ও করে নি। তাদের ভাষা স্থানীয় সভ্য সমাজের মানুষের কাছে দুর্বোধ্য ও অবোধ্য ছিল। স্থানীয় লোকজন তাদের সমন্ধে আমাদের সাবধান করে দিয়েছিলেন। তাদের মহিলারা অর্দ্ধ উলঙ্গ হওয়ার জন্য কোনো বদমাশ লোক সেইসব মহিলাদের সাথে কোনো অশোভন আচরণ বা বদমাশী করলে তারা তত্ক্ষণাত্ বিষ মাখানো তির দিয়ে তাদের এফোড়ওফোড় করার জন্য দুবার ভাবতো না।
সভ্য সমাজের স্থানীয় প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার কথা ভাবতেই পারে না বা সেইসব সভ্য সমাজের নিয়ম কানুন তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সেখানে ছয়মাস থাকার পর প্রজেক্টের কাজ শেষ করে সশরীরে কলকাতায় ফিরে এলাম।
তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোর শহরের নিকটবর্তী স্থান মধুক্কড়াইতে (কোয়েম্বাটোর থেকে মধুক্কড়াই দূরত্ব মাত্র ২২ কিলোমিটার এবং জার্নি টাইম মাত্র ২০ মিনিট) এ সি সি সিমেন্ট কোম্পানির প্রোডাকসান প্ল্যান্টে কাজের প্রয়োজনে যাওয়ার দরকার পড়েছিল।
সেই সময়ে সুযোগ ও সুবিধা অনুযায়ী মাঝে মাঝে প্রায়ই ছুটির দিনে কোয়েম্বাটোর শহরের নিকটবর্তী নীলগিরী পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত উটি শহরে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কখনো একা একা বা কখনো সংগী সাথিদের সাথে উটি শহর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে পরতাম।
কোয়েম্বাটোর থেকে উটি শহরের দূরত্ব মাত্র ৮৫ কিলোমিটার, কোয়েম্বাটোর থেকে উটির জার্নি টাইম মাত্র ২.৩০ ঘন্টা। উটি শহরের উচ্চতা ৭৫০০ ফুট, সাধারণ তাপমাত্রা ৫ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে । গাঢ় নীল রঙের কুরুণ্জী ফুল ১২ বছর অন্তর একবারই সারা পাহাড়ের পাদদেশ থেকে চূড়া অবধি ফুটে সারা পাহাড়ের নীলাভ শোভার দৃশ্য অতুলনীয় করে তোলে, তাই এই পাহাড়ের নাম নীলগিরী পর্বতমালা। সকাল সাতটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট করে বাসে করে উটির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যেতাম।
পাহাড়ের পাকদণ্ডি পথ অতি ক্রম করে চারপাশর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে করতে সকাল দশটার মধ্যে উটি পৌছে যেতাম এবং সারাদিন উটি শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান যেমন - আভালেণ্চ হ্রদ, উটি হ্রদ, এমার্ল্ড হ্রদ, ডিয়ার পার্ক, কামরাজ সাগর ড্যাম, কালহাট্টি ওয়াটার ফলস্, ডোড্ডাবেট্টা পিক, সানসেট ভিউ পয়েন্ট, নীডলরক ভিউ পয়েন্ট, ডলফিন নোজ দেখে ঘোরাঘুরি করে বিকাল পাচঁটার বাসে চেপে রাত আটটার মধ্যে কোয়েম্বাটোর শহরের হোটেলে ফিরে আসতাম।
কোম্পানির কাজের প্রয়োজনে কখনো কখনো আবার ছুটির দিনে সুযোগ ও সুবিধা অনুযায়ী পালাক্কা (কেরলা) অঞ্চলের মালাম্ফুজা ড্যাম্প, কোচিন শহর, এরনাকুলাম শহর, ত্রিচি শহর, ত্রিচুরাপল্লী শহর, বাইপিন দ্বীপ ঘুরে দেখে, ভ্রমণ করে হোটেলে ফিরে আসতাম।
কখনো কখনো আবার কোম্পানির কাজে প্রায়ই নেইভেলি লিগনাইট করপোরেশনের খাদানে যাওয়ার দরকার পড়তো।
ঐ খানে কোনো এক সময় কাজ চলাকালীন ওখানকার এক স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারের মেয়ের বিয়েতে আমাকে বিশেষ ভাবে সারাদিনের বিবাহের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
তামিলিয়ান পরিবারের বিবাহ অনুষ্ঠানের আচার অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ আমার পূর্বে হয় নি। সেই বিশেষ কারনে এবং আমার ও প্রচুর কৌতুহল নিবারন করার সুযোগ পেয়ে আমি তার সদব্যবহার করে নিলাম। সেখানে কোম্পানির কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলাম।
কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের আদেশে গুজরাতের কচ্ছ জেলার গান্ধীধাম পোর্টের কাছে আমাকে একটি ক্যামিকাল সার তৈরির কোম্পানি ইন্ডিয়ান ফার্মাস ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে (IFFCO) তে স্পেশাল কনসাইনমেন্টে ৩ বছরের জন্য পোস্টিং করা হয়। গান্ধীধামে আমার পোস্টিং এর সঠিক সময়কালের তারিখ মাস বছর এই সময়ের স্মরণ শক্তির ভান্ডার হাতরে পাঠকজনের সামনে ঠিকমতো উপস্থাপন করা সম্ভব হল না বলে দুঃখিত। হাওড়া থেকে গান্ধীধাম যাওয়ার জন্য সেই সময়ে সরাসরি কোনো ট্রেন ছিল না। হাওড়া থেকে গান্ধীধামের দূরত্ব ২৫২৬ কিলোমিটার, হাওড়া থেকে গান্ধীধামের জার্নি টাইম ৪৪ ঘন্টা।
সেই সময়ে গান্ধীধাম যাওয়ার জন্য আমেদাবাদ এক্সপ্রেসের সাথে দুইটি কম্পার্টমেন্ট (একটা ফার্স্ট ক্লাস, একটা জেনারেল কম্পার্টমেন্ট) জুড়ে দেওয়া হতো। ট্রেনটি আমেদাবাদ পৌছোনোর পর এবং কম্পার্টমেন্ট দুটি আমেদাবাদে স্টেশনের মাঝের লাইনে ৪ ঘন্টা অপেক্ষা করার পর বোম্বে থেকে সরাসরি গান্ধীধাম যাওয়ার জন্য গান্ধীধাম এক্সপ্রেসের সাথে দুইটি কম্পার্টমেন্ট দুইটি জুড়ে দেওয়া হতো। হাওড়া থেকে আমেদাবাদ এক্সপ্রেসে ফার্স্টক্লাস ট্রেনের টিকিট কেটে রওনা হয়ে গেলাম। ট্রেন সকাল ১১ টায় হাওড়া থেকে ছেড়ে দিলো। প্রথম দিন ট্রেনে কোনো অসুবিধা ভোগ করতে হয় নি।দ্বিতীয় দিন সকাল দশটার পর সম্পূর্ণ ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টে আমি ছাড়া আর কোনো যাত্রী ছিল না। কোচ এটেন্ডেন্ট আমাকে কম্পোনেন্টের দুদিকের চারটি দরজা বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়ে তার অন্য কলিগদের সাথে টাইম পাস করার জন্য অন্য কম্পার্টমেন্টে চলে গেলেন। ট্রেন ছুটে চলেছে আর সম্পূর্ণ ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টে আমি সম্পূর্ণ একা। আমার ভয় ভয় করতে লাগল। এই ভাবে দীর্ঘ ১০ ঘন্টার পর রাত আটটা নাগাদ ট্রেনটি আমেদাবাদ স্টেশনে পৌছালো।
আমাদের কম্পার্টমেন্ট দুইটি কে আমেদাবাদ স্টেশনের মাঝের লাইনে ডিকাপ্লিং করে ইঞ্জিনটি বাকি কম্পার্টমেন্ট গুলোকে নিয়ে কারসেডে চলে গেল। রাত ১ টা নাগাদ বোম্বে থেকে গান্ধীধাম এক্সপ্রেস আসার পর আমাদের কম্পার্টমেন্ট দুইটি কে আবার কাপ্লিং করে আমেদাবাদ স্টেশন থেকে নতুন যাত্রী নিয়ে পরের দিন সকাল ৯ টায় গান্ধীধাম রেলওয়ে স্টেশনে পৌছলাম।
যেই প্রোডাক্ট নিয়ে আমরা IFFCO তে কাজে নিযুক্ত হয়েছিলাম সেই প্রোডাক্ট টি ভারতবর্ষে তৈরি হতো না, প্রোডাক্ট টি Italian Company TAMBURUNI কোম্পানির বিশেষ product - Anticorrosive liner product ছিল এবং সেটা Itali থেকে Import করা হয়েছিল।
তাই Itali থেকে সেই কোম্পানির কনসালটেন্ট প্রতিনিধি Mr Angealo Boshsi টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার প্রয়োজনে Itali থেকে India তে এসেছিলেন এবং ৩ বছরের জন্য তাকে ও আমার সাথে গান্ধীধামে পোস্টিং করা হয়।
গুজরাতের কচ্ছ জেলা পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে ৬০ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত। রাত্রিবেলায় গান্ধীধাম শহরের বাঁধাহীন ধু ধু খালি বিস্তৃত প্রান্তর থেকে করাচি বন্দরের মৃদু আলোর রেখা দেখা যেত।
গুজরাতের কচ্ছ জেলা সমুদ্র থেকে লবণ তৈরির জন্য বিখ্যাত। গান্ধীধাম বন্দরের চারপাশের জমি চাষের অযোগ্য ছিল। ভারতের সমস্ত লবণ তৈরির কোম্পানি গুলো বড় বড় পাম্প চালিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত নিচুতলার জমিতে সমুদ্রের জলকে সূর্যের তাপে শুকিয়ে লবনের Raw material তৈয়ারি করতো।
পরবর্তীকালে আর ও বিভিন্ন প্রসেসর মাধ্যমে রিফাইনিং করে আমাদের ব্যবহারের জন্য খাদ্য উপযোগী লবণ তৈরি করে মার্কেটে পাঠানো হতো।
সেই সময়ে কচ্ছ জেলার ঐ অঞ্চলে টানা চার পাঁচ বছরে কোনো বৃষ্টিপাত হয় নি। কিন্তু মিঃ বসি গান্ধীধামে আসার একমাস পর থেকে অঝোরে বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল এবং একটানা ১৫ দিন ধরে বৃষ্টিপাত হয়ে গত কুড়ি বছরের বৃষ্টির রেকর্ড সৃষ্টি করে ছিল।
তাই কোম্পানির লোকজন মিঃ বসিয়াকে দেবদূত বলে ডাকতে আরম্ভ করে দিল। মিঃ বসিয়া ইটালিয়ান ভাষা ছাড়া ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বুঝতে ও বলতে পারতেন। ঐ কাজের প্রয়োজনে কলকাতা থেকে আমার সংগে আমার কোম্পানির দশ বারোজনের স্পেসালাইজড Working team ছিল।
একটা ৫০ ফিট উচ্চতা এবং ৪০ ফিট ব্যাসার্ধ বিশিষ্ট ক্যামিকাল রিজার্ভারে Anti-corrosive liner Erection এর কাজে ইটালি থেকে মিঃ বসিয়া এবং কলকাতা থেকে IFFCO তে আমাদের আগমন।
ঐ রিজার্ভারের কাজের প্রয়োজনে বোম্বে থেকে ৫০ ফিট উচ্চতা সম্পন্ন বিশেষ ভাবে অর্ডার দিয়ে তৈরীর Trolly fitted Specialised scaffolding এর ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।
অবসর সময়ে ছুটির দিনে স্থানীয় লোকজনদের সাথে নিয়ে স্থানীয় প্রধান উত্সবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলি দেখতে মিঃ বসিয়া এবং আমাদের কোলকাতার কোম্পানির পুরো দল নিয়ে চলে যেতাম। নবরাত্রি, ডান্ডিয়া ড্যান্স দেখতে টিকিট কেটে ঐ সব লোকনৃত্য দেখার সুযোগ পরিপূর্নরূপে উপভোগ করতাম। ছুটির দিনে সময় ও সুযোগ অনুযায়ী নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান যেমন আম্বে ধাম মন্দির, আয়না মহল প্যালেস, সিনাই লেক, শ্রী স্বামীনারায়ণ মন্দির, রান অফ কচ্ছ, হোয়াইট ডেজার্ট ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
কোনো এক সময় কাজের মাঝে মিঃ বসিয়ার উপস্থিতিতে ঐ ৫০ ফিট উচ্চতা সম্পন্ন scaffolding টি ভেঙ্গে পড়ে এবং কপাল জোরে ঐ ঘটনায় মিঃ বসিয়া বা আমাদের টিমের কারো কোনো আঘাত লাগেনি এবং সেই সময়ে আমরা কোনো ক্রমে রক্ষা পেলাম।
৩ বছর পরে আমরা ওখানকার কাজ সুস্ঠভাবে শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলাম।
বোম্বেতে যাতায়াতের সময় একটা মজার ব্যাপার ঘটেছিল যেটা সবার সাথে সেয়ার করার সুযোগ হাতছাড়া করতে মন চাইছে না।
অফিসের কাজের প্রয়োজনে বোম্বেতে ঘন ঘন টুর করার প্রয়োজন হতো।
একবার গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেসে বোম্বে যাওয়ার সময় গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেস প্রায় ৪ ঘন্টা লেটে রান করে রাত ২ টার সময় বোম্বে ভিক্টোরিয়া টার্মনাল তে পৌছায়।হোটেলে চেক ইন করতে করতে রাত প্রায় ৩ টা বেজে গিয়েছিল। লম্বা ট্রেন সফর এবং অত গভীর রাতে অভুক্ত অবস্থায় হোটেলের নরম গদিতে শরীরকে এলিয়ে দিতে বেশি সময় লাগলো না।
পরের দিন সকাল ১০ টায় একজন ক্লায়েন্টের সাথে আগে থেকেই মিটিং এর পরিকল্পনা ছিল। হোটেলে সকাল ৮ টায় ওকআপ কল বুক করে ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বাভাবিক ভাবেই ঘুমের চোখে সকাল ৮ টায় হোটেল ইন্টারকাম মারফত ওকআপ কল রিসিভ করে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। সেই ঘুম ভাঙল বেলা সাড়ে এগারোটায়।
মনে মনে চিন্তা করলাম মিটিং টাইম ১০ টায় ছিল কিন্তু সেই সময় ইতিমধ্যে অতিক্রম করে গেছে, অতএব বিকাল ৩ টায় পরবর্তীত্ব মিটিং এর কথা মাথায় রেখে সকাল ১১ টায় ঘুম থেকে ওঠার প্রতিশ্রুতি করে পরিশ্রান্ত শরীরকে আবার নরম বিছানায় ছুড়ে দিলাম।
আবার ঘুম ভাঙল সন্ধ্যা ৭ টায়। পুনরায় চিন্তা করলাম পুরো ২৪ ঘন্টা আমি অভুক্ত, সকাল থেকে ব্রেকফার্স্ট, লাঞ্চ ইতিমধ্যে খাওয়া হয় নি। এখন কিছু স্ন্যাকস খেলে রাতে আর কিছু খাওয়া সম্ভব হবেনা। তার চেয়ে রাত ৯ টায় ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে নেওয়া যাবে। সেই মতো চিন্তা করে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। সেই ঘুম ভাঙল রাত ১ টায়, যখন হোটেলের ডাইনিং হল ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অগত্যা পরের দিন সকাল ৬ টায় ঘুম থেকে উঠে স্নানপর্ব শেষ করে, হেভি ব্রেকফার্স্ট করে ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং এর উদ্দেশ্য রওনা হয়ে সারাদিন বোম্বের বিভিন্ন স্থানে কাজ শেষ করে রাত ৮ টার সময় হোটেলে ফিরে এলাম।
কলকাতায় ফেরার চার পাঁচ দিন পর আবার কর্নাটকের ব্যাঙ্গালোর, ম্যাঙ্গালোরের কুদ্রেমুখ আয়রন ওর মাইন্সের প্যালেট প্ল্যান্ট , চিকমাগুলুর জেলার কুদ্রেমুখ আরয়ন ওর মাইন্সের কাজের প্রয়োজনে অফিসিয়াল অর্ডার হাতে পেয়ে লোটা কম্বল নিয়ে ঘর ছেড়ে বেড়োবার প্ল্যান করা আরম্ভ করলাম।
হাওড়া থেকে মাদ্রাজ সেন্ট্রাল এর দূরত্ব ১৭০০ কিলোমিটার এবং জার্নি টাইম প্রায় ২৫ ঘন্টা। মাদ্রাজ সেন্ট্রাল থেকে ম্যাঙ্গালোরের দূরত্ব ৯০০ কিলোমিটার এবং জার্নি টাইম প্রায় ১৫ ঘন্টা।
হাওড়া থেকে বিকাল ৪ টার সময়ে করোমন্ডল এক্সপ্রেসে মাদ্রাজ সেন্ট্রাল এর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম এবং মাদ্রাজে পরের দিন বিকেল ৫ টায় পৌছে সেদিনের মতো মাদ্রাজে বিশ্রাম নিয়ে পরের দিন মাদ্রাজ সেন্ট্রাল থেকে ওয়েস্ট কোস্ট এক্সপ্রেসে দুপুর ১.১৫ ঘন্টার সময়ে ট্রেনে উঠে পরের দিন সকাল ৭ টায় ম্যাঙ্গালোরে পৌছলাম।
ম্যাঙ্গালোর শহরটি খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সাজানো শহর। অবশ্য জনসংখ্যা, স্থানীয় যানবাহন কলকাতা থেকে অনেক কম। শহরে শিক্ষিতের হার ৯০ % এর বেশি। ম্যঙ্গালোর বন্দর এবং ম্যাঙ্গালোর শহর পাশাপাশি হওয়ার জন্য ম্যাঙ্গালোরের স্থানীয় বাজারটি দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, সুপারি, কাজুবাদামের বিরাট বড় বিদেশে এক্সপোর্ট কেন্দ্র হিসেবে পড়িচিত। এই শহরে কোনো ভিখুক আমার নজরে পড়ে নি।
ম্যাঙ্গালোর বন্দরের গা ঘেঁষে ম্যঙ্গালোর প্যালেট প্ল্যান্ট এ আমি প্রায় কাজের প্রয়োজনে দুই বছর পোস্টিং ছিলাম।
অবসর সময়ে ছুটির দিনে স্থানীয় লোকজনদের সাথে নিয়ে স্থানীয় প্রধান উত্সবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলি দেখতে চলে যেতাম।
স্থানীয় ড্যান্সের অনুষ্ঠান দেখতে টিকিট কেটে ঐ সব লোকনৃত্য দেখার সুযোগ পরিপূর্নরূপে উপভোগ করতাম। ম্যাঙ্গালোর বন্দরের গা ঘেঁষে ম্যঙ্গালোর প্যালেট প্ল্যান্ট এ আমি প্রায় কাজের প্রয়োজনে দুই বছর পোস্টিং ছিলাম।
চিকমাগুলুর জেলার পাহাড়ের চূড়ায় কুদ্রেমুখ আয়রন ওর মাইন্সে র কাজের জন্য ও মাঝে মাঝে ম্যাঙ্গালোর থেকে কুদ্রেমুখ যাওয়ার প্রয়োজন হতো।
ম্যঙ্গালোর পর্তুগিজ অধুস্থিত অঞ্চল। ছুটির দিনে স্থানীয় বন্ধু বান্ধবদের সাথে ম্যঙ্গালোরের দর্শনীয় স্থান যেমন পানাম্বুর সী বীচ, সুরথকল সী বীচ, কোডিকাল সী বীচ, সোমেশ্বর সী বীচ, উল্লাস সী বীচ, সশিহুথ্লু সী বীচ, তন্নিরভাবি সী বীচ, চিত্রপুড়া সী বীচ, মালপে সী বীচ, কাতিল দূর্গাপরমেশ্বর মন্দির, শ্রী মঙ্গলাদেবী মন্দির, কাদ্রিশ্রী মঞ্জুনাথ মন্দির, সেন্ট আলোয়াশীষ চার্চ, কারকালা, ভেনুর, উডিপি, ধরমস্থল, কুদ্রেমুখ, শ্রিঙ্গেরী, আগুম্বে জলপ্রপাত, কুক্কে সবরোমানাইয়া মন্দির, মুরুদেশ্বর মন্দির ইত্যাদি স্থানে ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
কখনো কখনো কুদ্রেমুখে কাজের প্রয়োজনে ম্যাঙ্গালোর থেকে ১০০ কিলোমিটার দুরে কুদ্রেমুখে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কুদ্রেমুখ আয়রন ওর মাইন্সের চারিদিকে পাহাড় বেষ্টিত ভ্যালির গেস্ট হাউসে গিয়ে থাকতে হত। কুদ্রেমুখ আয়রন ওর মাইন্সের গেস্ট হাউসটি প্রকৃতির মাঝে সৌন্দর্যটি অতুলনীয়।
কোনো এক সময় জার্মান থেকে স্কেগা কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিঃ টম হ্যারি ইন্ডিয়াতে পাঠানো তাদের দেশের প্রোডাক্টের পারফরম্যান্স দেখার জন্য কুদ্রেমুখ আয়রন ওর মাইন্সে এসেছিলেন।
মিঃ হ্যারি কুদ্রেমুখ আয়রন মাইনাস আমার সঙ্গে প্রায় ১৫ দিন ছিলেন। তার সান্নিধ্যে আমি অনেক কিছুই শিখেছিলাম।
সেই সময়ে ছুটির দিন গুলো তে সময় ও সুযোগ অনুযায়ী কুদ্রেমুখের নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান যেমন হনুমান গুন্ডি জলপ্রপাত, কাল্লাদিগিরি জলপ্রপাত, হেব্বে জলপ্রপাত, শ্রী অন্নপূর্নেশ্বর মন্দির, কালাশা চূড়া, কাদম্বী জলপ্রপাত, বাবা বুদাঙ্গিরী শৃঙ্গ, মুলায়ানাগিরী শৃঙ্গ, ঝাড়ি জলপ্রপাত ইত্যাদি স্থানে ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
ম্যাঙ্গালোর এবং কুদ্রেমুখের কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে আসার এক সপ্তাহ পর আবার আমাকে কোম্পানির কাজের প্রয়োজনে কর্নাটক, মাইশোরের কোলার গোল্ড ফিল্ডের সোনার খনিতে কাজের জন্য ডেপুটেশনে পোস্টিং করা হয়েছিল।
ব্যাঙ্গালোর থেকে ১০০ কিলোমিটার দুরে মাইশোরের কোলার শহর অবস্থিত। কোলার শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দুরত্বে কোলার গোল্ড ফিল্ডের সোনার খনি।
১৮৮৯ সাল থেকে ভারতবর্ষের কর্নাটকের কোলার ডিস্ট্রিকে রবার্টসনপেট অঞ্চলে কোলার গোল্ড ফিল্ড (KGF) Area তে সরকারি কেন্দ্রীয় সংস্থা ভারত গোল্ড মাইন্স লিমিটেড (BGML) প্রথম পাওয়ার সাপোর্ট স্বর্ণ খনির উত্তোলন আরম্ভ হয়।
স্বর্নের খনিজ ধাতুর নাম CALAVERITE or SYLVANITE (৩ % গোল্ড) পাওয়া যায়।
১ টন গোল্ড খনিজ ধাতুর থেকে মাত্র ৩০ কিলোগ্রাম গোল্ড পাওয়া যায়।
স্বাভাবিক কারণেই সোনার খনিতে সিকিউরিটি সিস্টেম সব সময়ে খুবই কড়া পাহারায় থাকতো। খনিতে প্রবেশ এবং খনি থেকে বেড়িয়ে আসার সময় মহিলা ও পুরুষদের এয়ারপোর্টের ধরনের সবরকম ভাবে মেটাল ডিটেক্টর চেকিং এবং অন্যভাবে চেকিং করে ছাড়া হতো।
খনি এবং সংলগ্ন ম্যটারিয়াল হ্যান্ডলিং প্ল্যান্টের সব জায়গায় ২৪ ঘন্টা ক্লোজ্ড সারকিট টিভির আওতায় সবাইকে নজরের আওতায় রাখা হতো। ঐ সোনার খনি ও প্ল্যান্টের সংরক্ষণের দ্বায়িত্ব বি এস এফের (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) ওপর সরাসরি দিল্লির অর্থমন্ত্রকের দ্বারা কন্ট্রোল করা হয়।
সাধারণত ভারতের সব ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্ড্রাস্টিতে সংরক্ষণের দ্বায়িত্ব সি আই এস এফের (সেন্ট্রাল ইন্ড্রাস্টিয়াল সিকিউরিটি ফোর্স) ওপর নির্ভরশীল।
ঐ সোনার খনির অ্যাকটিং অপারেশন জেনারেল ম্যানেজারের সিলেকশন এবং পোস্টিং দিল্লির অর্থমন্ত্রকের অধীনের আওতাধীনে থাকে, তাই কখনো কোনো স্থানীয় ব্যক্তির ঐ পোস্টে দ্বায়িত্ব সামলানোর সুযোগ হতো না।
এইসব কারণে চিফ সিকিউরিটি অফিসার এবং জেনারেল ম্যানেজারের সিলেকশন এবং পোস্টিং ইস্টার্ন, নর্দান, ওয়েস্টার্ন ভারত থেকে হয়ে থাকে।
কাজের প্রয়োজনে যেহেতু আমি বহুদূর কলকাতা থেকে কোলারে ডেপুটেশনে গিয়েছিলাম সেহেতু সিকিউরিটি অফিসারদের এবং জেনারেল ম্যানেজারের সাথে আমার ভালোই সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
আমাদের নতুন যেই সুইডেন কোম্পানির তৈরি মেশিন স্থাপনের উদ্দেশ্যে আমি ওখানে গিয়েছিলাম, আমাদের মেশিনের মূল্যের চারগুন বেশি অর্থ পুরাতন মেশিন ওয়াশ করার সময় সোনার গুড়ো থেকে কোলার সোনার খনির কোম্পানির আয় হয়েছিলো।
এরই মধ্যে কাজের ফাঁকে সিকিউরিটি অফিসারদের বদান্যতায় সেন্ট্রাল সিকিউরিটি ফোর্সের কন্ট্রোল রুমে গিয়ে কি ভাবে সোনার খনির সব জায়গায় ২৪ ঘন্টা নজর রাখা হয় সেই সিকিউরিটি সিস্টেম টা দেখার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছিল।
কিন্তু এত কড়া পাহারা সত্বেও কি ভাবে স্থানীয় কর্মচারীরা কাজের মাঝে সোনার ওর ধাতু খেয়ে ফেলার চেষ্টা করে এবং মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে চেক করে ধরার পর তাদের কোম্পানির জেলখানায় বন্দি করে ৭২ ঘন্টা আটকে রেখে, তাদের পটির দ্বারা সোনার ওর ধাতু শরীর থেকে বার করে, তাদেরকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সোনার খনির ১০০ ভাগ পরিশোধিত সোনা সেন্ট্রাল ভল্টে সি সি টিভির আওতায় রাখা হয়। সেই ভল্ট বন্ধ বা খোলার জন্য চারটি চাবির প্রয়োজন হয়।
চাবি চারটি যথাক্রমে জেনারেল ম্যানেজার, চিফ সিকিউরিটি ইন-চার্জ, ডিপার্টমেন্টাল সুপারভাইজার, ডিপার্টমেন্টাল সিকিউরিটি সুপারভাইজারের কাছে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
আমার কাজ শেষ করার পর কোলার গোল্ড ফিল্ড ছাড়ার আগে জেনারেল ম্যানেজারের বদান্যতায় সেন্ট্রাল ভল্ট খুলে আমার সোনার কয়েন, সোনার বিস্কুট, সোনার বাট ও সোনার ব্রীক দেখার সুযোগ ও সৌভাগ্য হয়েছিল।
দুঃখের ব্যাপার কোলার গোল্ড মাইন্স টা অজানা কারণে গত ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ২০০১ থেকে বন্ধ হয়ে যায় ।
কোলার গোল্ড ফিল্ডের কাজ শেষ করে মাইশোরের দর্শনীয় স্থান যেমন মাইশোর প্যালেস, বৃন্দাবন গার্ডেন, ভেনুগোপালস্বামী মন্দির, নামদ্রলিং মনেস্ট্রি, সোমনাথপুর মন্দির, মেলকোটে, শ্রী চামুন্ডেশ্বরী মন্দির, শ্রী চামারাজেন্দ্র জুওলজিকাল গার্ডেন ইত্যাদি স্থানে ঘুরে ব্যাঙ্গালোর ফিরে আসি।
আমি ব্যাঙ্গালোর এসে ব্যাঙ্গালোর শহরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান যেমন লালবাগ বোটানিক্যাল গার্ডেন, কাব্বন পার্ক, শ্রী সূর্যনারায়ন স্বামী মন্দির, রাগিগুড্ডা শ্রী প্রসন্ন অঞ্জনাইয়াস্বামী মন্দির, গাভি গঙ্গধারেশ্বর মন্দির, মালেশ্বরম মন্দির, বেনারঘাট্টা ন্যাশানাল পার্ক, ব্যাঙ্গালোর প্যালেস, নন্দি হিলস্, ইনোভেটিভ ফ্লিম সিটি, টিপু সুলতান সামার প্যালেস, বিধান সৌধ, উলসুল লেক, শিভ মন্দির, এম জি রোড, সেন্ট মেরি বেসিলিকা চার্চ, চুনচি জলপ্রপাত, পার্ল ভ্যালি, দেভানাহালি দূর্গ, হালাসুরু সোমেশ্বর মন্দির ইত্যাদি স্থান ঘুরে কলকাতায় ফিরে এলাম ।
গতানুগতিক ভাবে কলকাতায় ফেরার এক সপ্তাহের মধ্যে ভারতের বিখ্যাত ইউরেনিয়াম খাদান যদুগোডায় যাওয়ার আবার ডাক পড়ল।
যদুগোডায় যাবার জন্য হাওড়া থেকে সকাল ৬.৩০ টার ট্রেনে রাখা মাইন্স স্টেশনে দুপুর ১২ টা নাগাদ (৫ ঘন্টা সময় লাগে) পৌছে যাওয়া যায়।
রাখা মাইন্স স্টেশনটি ঘাটশিলা এবং টাটানগর স্টেশনের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। রাখা মাইন্স স্টেশন থেকে ইউ সি আই এল (ইউরেনিয়াম করপোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড) যাদুগোডা পৌছতে স্থানীয় টোটো করে সময় নেয় মাত্র ৩০ মিনিট। দুপুর ১টা নাগাদ UCIL Jadugoda Guest House এ পৌছে গেলাম।
বেলা ৩ টার সময় ফ্রেস হয়ে নিয়ে UCIL Office এ কাজের প্রয়োজনে রিপোর্ট করলাম।
পরের দিন সকাল ১০ টা থেকে সেখানকার কাজ আরম্ভ করে ১৫ দিনে সেখানকার কাজ শেষ করে হিন্দুস্তান কপার লিমিটেড (HCL) ঘাটশিলার এসে রিপোর্ট করলাম।
যদুগোডা থেকে ঘাটশিলা ট্রেনে পৌছতে সময় লাগে ৩০ মিনিট (সারাদিনে রাখা মাইন্স থেকে ঘাটশিলা যাওয়ার ট্রেন মাত্র হাতে গোনা ৪ কি ৫ টি)।
যদুগোডা থেকে ঘাটশিলা গন পরিবহন ব্যবস্থা বাসে সময় নেয় প্রায় ২ঘন্টা।
যাতায়াতের রাস্তা এবং গন পরিবহন ব্যবস্থা এতই করুণ এবং অপ্রতুল ছিল যে আমাদের পক্ষে খুবই কস্টসাধ্য ব্যাপার ছিল।
২ ঘন্টা অন্তর পর পর একটি ঝড়ঝরে বাসের ওপর নির্ভর করে যাতায়াত করতে হতো।
কিন্তু ঘাটশিলা, মোসাবনীর জল, আবহাওয়া এবং মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ শরীর ও মনের দুই এর পক্ষে খুবই উপযোগী ছিল।
সুবর্ণরেখা নদীর ধারেই HCL কোম্পানির ঘাটশিলা এবং মোসাবনী ইউনিট ২ টা অবস্থিত। সুবর্ণরেখা নদীর চড়ার বালি থেকে সারা বছর স্থানীয় লোকজনরা খাঁটি সোনা সংগ্রহ করে ধুয়ে সারা জীবন প্রতি পালিত করে।
সন্ধ্যার পর চারিদিকের ঘন জঙ্গলে ভালুক, বন্য মহিষ, বুনো শুকর, মহুয়া ফল খাবার জন্য ঘুড়ে বেড়াতে দেখা যায় এবং তাদের ডাক শুনতে পাওয়া যায়।
১০ থেকে ১৫ দিন করে ঘাটশিলা ও মোসাবনী এই ২ জায়গার কাজ শেষ করে রাখা আয়রন ওর মাইন্সের কাজের প্রয়োজনে রাখা মাইন্সে রিপোর্ট করলাম।
ঘাটশিলা, মোসাবনী, যদুগোডা, রাখা মাইন্সের অঞ্চলে কোম্পানির কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই এইসব অঞ্চলে যাতায়াতের প্রয়োজন হতো।
বিশেষ করে বর্ষাকালে জোৎস্না রাতে কাজের শেষে সন্ধ্যার সময় ঘাটশিলা, মোসাবনী, রাখা মাইন্সের অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ১০০ ভাগ বৃদ্ধি পেত।
এইসব প্রকৃতির সীমাহীন প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো সঠিক মন ও দৃষ্টি না থাকলে প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করা অসম্ভব।
কোনো এক সময় রাখা মাইন্সের কাজ ও শেষ করে কলকাতায় ফিরে এসেছিলাম।
১৯৯০ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর কোম্পানির কাজের ধরন অনুযায়ী পারিবারের প্রয়োজনে সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। অগত্যা আবার কর্মস্থল পরিবর্তন করার চিন্তা ভাবনা কোমর বেঁধে পুরো দমে আরম্ভ করে দিলাম।
১৯৯১ সালে প্রথম কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করার পর সেই সুযোগ (কিংবা দুর্যোগ ) হস্তগত হল, ১৯৯১ সালে একটি পৃথিবী বিখ্যাত স্বদেশী কোম্পানির একটা ব্রাঞ্চ কোম্পানির সাথে কোম্পানির জন্মলগ্ন থেকে (কতিপয় ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে গঠিত কোম্পানিতে) যুক্ত হওয়ার সুযোগ হস্তগত করি।
সম্ভবত ১৯৯৩ সালে কোনো একটি লেভেল লাফিং ক্রেন যন্ত্রদানবের (যার সম্পূর্ণ ওজন প্রায় ৬০০ মেট্রিক টন) একটি অংশ রানিগঞ্জের একটি সাব ভেন্ডার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে তৈরি করতে বরাত দেওয়া হয়েছিল।
সারা ভারতবর্ষের এবং বিদেশের বিভিন্ন কোম্পানিতে যখন যন্ত্রটির বিভিন্ন অংশটির প্রায় ৯০ ভাগ তৈরি হওয়ার মুহূর্তে, রানিগঞ্জের বরাত পাওয়া সাব ভেন্ডার কোম্পানির শ্রমিকদের দাবি দাওয়ার পুরনের দাবিতে শ্রমিকরা কোম্পানির উৎপাদনের কাজ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় এবং শ্রমিক ইউনিয়নের লোকেরা কোম্পানির প্রবেশ পথ অধিকার করে প্রায় ২৪ ঘন্টা ধর্নায় বসে যায়।
কিন্তু ঐ যন্ত্রটির বাকি সব অংশ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হয়ে যাওয়ার কারনে সেইসব অংশগুলো কোম্পানির ক্লায়েন্টের সাইটে পৌছোনোর পর্যায়ে উপস্থিত হয়।
সেই মূহুর্তে আমাদের কোম্পানির প্রজেক্ট ইনচার্জের সুবুদ্ধির পরিচয়ে সেই সিচুয়েশন হ্যন্ডেল করতে আমাকে প্রয়োজনিয় নির্দ্দেশ সহ রানিগঞ্জে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়।
কোম্পানির পাওয়ার অফ এটর্নি সংক্রান্ত দলিল ও দস্তাবেজ তৈরি করে এবং রানিগঞ্জের বরাত পাওয়া
সাব ভেন্ডার কোম্পানির ম্যানেজমেন্টকে নির্দেশনামা পত্র সমেত আমি কোলকাতার অফিস থেকে সকাল সকাল রানিগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাই।দুপুর ১ টোর সময়ে রানিগঞ্জ পৌছে সারাদিন রানিগঞ্জের সাব ভেন্ডার কোম্পানির ম্যানেজমেন্টের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আসানসোল কোর্টে দৌড়ঝাপ করে কোর্টের ইনজাংসান অর্ডারের কপি হাতে পেতে পেতে প্রায় বিকাল ছয়টা বেজে যায়।রাত্রি প্রায় ১২টায় লোকাল পুলিশ থানার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কোম্পানির পেছনের গেট দিয়ে ট্রাক নিয়ে কোম্পানিতে প্রবেশ করে আমাদের যন্ত্রের অংশটি নিয়ে সারা রাত ট্রাকে করে কোলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যাই এবং পরের দিন বেলা একটায় কলকাতার অফিসে রিপোর্টে করি।
সেই মূহুর্তে আমাদের কোম্পানির জয়েন্ট ট্যাকনিকাল ম্যানেজিং ডাইরেক্টর ছিলেন একজন স্বনামধন্য জার্মান ডিরেক্টর মিঃ জেস্কে।মিঃ জেস্কে কোম্পানির সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এই ঘটনার বিবরণ শুনে ব্যক্তিগত ভাবে কোম্পানির অন্য ম্যানেজমেন্টের প্রতিনিধিদের সংগে করে আমার মতো কম বয়সের, অনভিজ্ঞ কোম্পানির সর্বকনিষ্ঠ একজন জুনিয়র টিমমেটকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করার জন্য গিফট অফ এপ্রিসিয়েসান শুদ্ধু সবাইকে নিয়ে কলকাতার অফিসের কনফারেন্স রুমে উপস্থিত হয়ে ছিলেন।
এই স্বীকৃতি আমার জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান বড় পুরস্কারের সমতুল্য।
কোনো একসময়ে রাউরকেল্লাতে কোনো এক মেশিনের অংশ তৈরীর সময় এবং ইনসপেক্সানের জন্য আমাকে প্রায় ৬০ ফিট উচ্চতায় কাজ করার জন্য উঠতে হয়। ঐ সময় হঠাত্ ই প্রচন্ড বেগে ঝড় বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে যায়। আমার সঙ্গে কোম্পানির আর একজন স্থানীয় অফিসার এবং ২ জন লেবার ছিল। ঐ উচ্চতায় ঝড়ের বেগ আর ও বাড়তে লাগলো। অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে পৌছালো ঝড়ের প্রচন্ড বেগ আমাদের ঐ ৬০ ফিট উচ্চতা থেকে নীচে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার উপক্রম।নীচে আমাদের এবং রাউরকেল্লার কোম্পানির সিনিয়ার ম্যানেজাররা প্রচন্ড টেনসানে পড়ে গেলেন।নীচ থেকে প্রচন্ড মুষলধারে বৃষ্টি ও ঝড়ের এবং স্বল্পদৃশ্যমান্যতার কারণে ওপরের আমাদের দেখতে বা আমাদের অবস্থান বুঝতে পারছিলেন না।
লেবার দুইজন বুদ্ধি করে আমাদের দুজনকে শক্ত দড়ি দিয়ে মেশিনের সাথে বেঁধে ফেল্ল, যাতে ঝড় আমাদের উড়িয়ে নীচে না ফেলে দেয়।ঝড়ের গতিবেগ কম হওয়ায় পর আমরা নীচে নেমে এসেছিলাম।
একবার বোম্বের এক পোর্টে কাজ করার সময় মেশিনের ৬০ ফিট উচ্চতায় আমাদের কাজ শেষ করে নীচে নামার সময় হঠাত্ ই পা পিছলে যায় এবং মেশিনের সাইড সেফ্টটি রেলিং না থাকার কারণে ৮০ ফিট নীচে সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হয়।
একবার বোম্বের আর এক পোর্টে কাজ করার সময় মেশিনের ১৬০ ফিট উচ্চতায় মেশিনের মধ্যে কাজ চলাকালীন আমাদের আর এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
এই সব ১৬ থেকে ১৮ তলার সমান উচ্চতার ৬০০ টন ওজনের দৈতাকার মেসিনের পোর্টে ৬০ ফিট চওড়া মেশিনের চলাচলের জন্য রেল লাইনের ব্যবস্থা ছিল।এই মেশিনগুলোতে রীতিমতো লিফ্ট, এসি, সিসি টিভি, ইন্টারনেটওয়ার্ক, পাবলিক অ্যানাউনুসিং সিস্টেমর ইত্যাদি সুযোগ সুবিধা রাখা হতো।
এই মেশিনের কামিশানিং এর সময় আমাদের ১৫ থেকে ২০ জন লেবারকে নিয়ে মেশিনের প্রায় ১২০ ফিট উচ্চতার ফ্লোর লেভেলে কাজ চলাকালীন নীচে রেলের চাকার ব্রেক ফেল করে এবং আমাদের সবাইকে নিয়ে মেশিন ধীরে ধীরে এন্ড স্টপার বাফার ভেঙ্গে সমুদ্রের জলের ভিতর সমাধি প্রাপ্তি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
আমাদের কোম্পানির প্রোডাক্ট ছিল পোর্টে বড় বড় জাহাজ থেকে ম্যাটারিয়াল লোডিং এবং আনলোডিং করার জন্য দৈতাকার ক্রেন ডিজাইনিং, ম্যানুফ্যাকচারিং, ইরেক্সান, কমিসানিং এবং সাপ্লাই ।
এক একটি ক্রেনের ওজন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টন, উচ্চতা ছিল প্রায় ১৮ থেকে ২০ তলা (২০০ ফিট) বিল্ডিং এর সমান।ক্রেনগুলি রেল লাইনের উপর দিয়ে চলাচল করার ব্যবস্থা থাকত।একটা রেল লাইন থেকে আর একটি লাইনের দুরত্ব প্রায় ৬০ ফিট।
এই ক্রেনে জার্মানের স্ম্যাগ কোম্পানির তৈরি গ্র্যাব বাকেট ব্যবহার করা হয় যেটা একবারে ২০ টন ম্যাটারিয়াল লোডিং এবং আনলোডিং করার ক্ষমতা রাখে।
এই ক্রেনে জার্মানের রোথার্ডে কোম্পানির তৈরি ১৭ ফিট ব্যাসের বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়।
এই ক্রেনে ১৭ ফিট ব্যাসের গিয়ার ব্যবহার করা হয় । এই সব গিয়ার একমাত্র ভারতের দিল্লির গাজিয়াবাদ এবং নয়ডা অঞ্চলের বিশেষ ৪ তলা উচ্চতা সমান দৈতাকার মেশিনে তৈরি করা হয়।
১৯৯১ সাল থেকে ২০০৫ সালে অফিসের এই ধরনের কাজের জন্য কখনো দিল্লির বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি গুলোতে এবং উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদ, নয়াডায়, হরিয়ানার ফরিদাবাদ, গুরগাঁও বিভিন্ন প্রান্তের ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি গুলোতে কাজের প্রয়োজনে চরকির মতো ঘুরে বেড়াত হতো।
সেই সুযোগে দিল্লির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সমেত ইন্দিরাগান্ধীর ফায়ারিং স্কোয়াড, রাজ ঘাট, ইন্ডিয়া গেট, অক্ষরধাম, রাষ্ট্রপতি ভবন, হুমায়ূন স্তূপ, কুতুব মিনার, লোটাস মন্দির, যন্তর মন্তর, জামা মসজিদ, লালকিল্লা ও দিল্লির অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ইত্যাদি জায়গা ঘুরে দেখার সৌভাগ আবার অজর্ন করেছিলাম।
কলকাতায় দক্ষিন কোরিয়ার কোম্পানি - ডুশানের প্রোজেক্টের কাজে একদল ইঞ্জিনিয়র প্রজেক্ট ফলো আপ করার জন্য ভারতে ডেপুটেশনে এসে প্রায় ২ বছর পোস্টিং ছিলেন ।
সেই দলে মিঃ ইল, মিঃ হো লি, মিঃ জো হোয়া লি, মিঃ ওয়ান জোয়া লি, মিঃ চ্যাং সন আহ্ ভারতে ছিলেন।
তাদের সান্নিধ্যে discipline, time management, values of word and time, quality related issues সমন্ধে অনেক কিছুই শেখার সুযোগ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্য ও ধন্য মনে করি।
কলকাতায় ফিরে আসার ৫ দিন পর হঠাত্ গুজরাতের আমেদাবাদে শহরের এলিকন গীয়ার বক্স ম্যানুফ্যাকচারিং এবং সাপ্লাইয়ার কোম্পানিতে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ইনস্পেকসান করার জন্য পোগ্রাম দেওয়া হল।
ট্রেনে ২৪ ঘন্টার মধ্যে আমেদাবাদে পৌছানো অসম্ভব ছিল।অতএব ইনস্পেকসান কল এটেন্ড করার জন্য আমার হাতে এয়ারোপ্লেনের টিকিট ধরিয়ে দেওয়া হল। এত কম সময়ে দমদম থেকে আমেদাবাদে যাওয়ার সোজাসুজি কোনো প্লেন ছিল না। অগত্যা পরের দিন ভোর ৪ টের ফ্লাইটে দমদম থেকে রওনা হয়ে গেলাম।
ফ্লাইট এর রুট আমেদাবাদে যাওয়ার জন্য ফ্লাইট ব্যাঙ্গালোর হয়ে আমেদাবাদে বিকাল ৩ টায় পৌঁছে যাই।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আমেদাবাদের এলিকন গীয়ার কোম্পানিতে ৩ দিন ইনস্পেকসানের কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলাম।
কলকাতায় ফিরে এক সপ্তাহ পর আবার নিপ্পোন - ডেনরো ইস্পাত নিগম প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মহারাষ্ট্রের রাইগড জেলার পেন, ডোলভি ভিলেজে কোম্পানির নিজস্ব বন্দরে বার্জ আনলোডার ইরেক্সানের কাজে সাইট ইনচার্জকে সাহায্য করার জন্য আমকে ২ বছরের জন্য পোস্টিং করা হয়।
হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ থেকে পনভেল রেলওয়ে জংশনের দূরত্ব প্রায় ১৯০০ কিলোমিটার এবং জার্নি টাইম প্রায় ৩৬ ঘন্টা।
হাওড়া ( হাওড়া থেকে মুম্বই সেন্ট্রালের দূরত্ব ১৮৮০ কিলোমিটার, জার্নি টাইম প্রায় ৩৫ ঘন্টা)। থেকে এক্সপ্রেস বা মেইল ট্রেনে মুম্বই সেন্ট্রাল।
মুম্বই সেন্ট্রালের ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাল থেকে (ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ টার্মিনাল থেকে পনভেলের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার, জার্নি টাইম প্রায় ১.৩০ ঘন্টা ) মসজিদ, স্যানড্রাস্ট, চুনাভাটি, কুড়লা রোড, তিলকনগর, চেম্বুর, গোভান্ডি, মানখুর্দ, ভাসি, সানপাডা হয়ে পনভেল জংশন। পনভেল থেকে আবার বাসে করে পেন শহরে পৌছতে হতো।
মহারাষ্ট্রের রাইগড জেলার একটা ছোট্ট শহর পেন, আম্বা নদীর তীরে ডোলভি ভিলেজে নিপ্পন- ডেনড়ো ইস্পাত নিগম লিমিটেড কোম্পানির নিজস্ব বন্দর। পেন শহরকে কেন্দ্র করে লোকালয়, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, মল, মার্কেট ইত্যাদি গড়ে উঠেছিল।
ঐ শহরের একটি সুন্দর সাজানো গোছানো হাউসিং কমপ্লেক্সের একটি ফ্ল্যাটে আমাদের থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমি ঐ সময়ে সপরিবারে ওখানে থেকে কোম্পানির কাজে যুক্ত ছিলাম। ঐ সময়ে কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই আলিবাগ, পনভেল যাওয়ার দরকার পড়তো।
অবসর সময়ে ছুটির দিনে স্থানীয় লোকজনদের সাথে নিয়ে স্থানীয় প্রধান উত্সবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলি দেখতে আমাদের কোলকাতার কোম্পানির পুরো টিম নিয়ে চলে যেতাম।
স্থানীয় ড্যান্সের অনুষ্ঠান দেখতে টিকিট কেটে ঐ সব লোকনৃত্য দেখার সুযোগ পরিপূর্নরূপে উপভোগ করতাম।
ছুটির দিনে সপরিবারে আলিবাগের আকসী সী বীচ, খান্ডেরী দুর্গ, কোলাবা দুর্গ দর্শনে বেড়িয়ে পরতাম।
এক বছরে পেনের মেশিন ইরেক্সান এর কাজ শেষ করে মুম্বই শহরের দর্শনীয় স্থান গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া, মেরিন ড্রাইভ, ডায়মন্ড নেকলেস, ম্যাজাগন ডক, এলিফ্যান্টা কেভ, শ্রী সিদ্ধি বিনায়ক মন্দির, হাজি আলি দরগা, জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারি, হ্যাঙ্গিং গার্ডেন, শ্রীমহালক্ষী মন্দির ইত্যাদি স্থান দর্শন করে কলকাতায় ফিরে আসি।
বোম্বের পেন বন্দরে কাজের প্রয়োজনে আমাকে প্রায়ই বোম্বে তে যাতায়াত করার প্রয়োজন হতো এবং পেন বন্দরে আবার ও ৬ মাসের জন্য পোস্টিং হয়ে গেল।সেই সময়ে পেন বন্দরে থাকাকালীন হঠাত্ খবর পেলাম বড় মেয়ের স্কুলের ভর্তির জন্য আমাকে ১ দিনের মধ্যে কলকাতায় ফেরত্ আসা খুবই জরুরি।
অগত্যা পেন বন্দরের কাজের সাইট থেকে সকাল ১১ টায় বেরিয়ে সান্তাক্রুজ এয়ারপোর্টে সন্ধ্যা ৬ টায় পৌছে পরের দিন সকাল ৫ টার এরোপ্লেন মারফত সকাল ৮ টার মধ্যে দমদমে পৌছে, কলকাতায় মেয়ের স্কুলের সকাল ১০ টায় অ্যাডমিসানের জন্য ইন্টারভিউ দিয়ে আবার পরের দিন সকালে দমদম থেকে প্লেনে বোম্বেতে ফিরে পেন বন্দরে বিকাল ৩ টায় মধ্যে পৌছে গেলাম।যথাসময়ে পেন বন্দরের কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলাম।
কলকাতায় ফিরে আসার এক সপ্তাহের মধ্যে আবার গোয়ার মরমুগা পোর্ট ট্রাস্ট, পান্জিম পোর্ট ইত্যাদিতে কোম্পানির প্রোডাক্ট স্ট্যাকার রিক্লেমার ইরেক্সানের সময় সাইট ইনচার্জকে সাহায্যের জন্য আমাকে ছয় মাসের জন্য গোয়াতে পোস্টিং করা হয়।
গোয়ার বেসিলিকা অফ বোম জেসাস চার্চে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্সের ৪০০ বছর পুরানো মমি সংরক্ষীত করা হয়েছিল এবং প্রতি ২৫ বছর পরপর তাহা সাধারন দর্শকদের দর্শনের জন্য ব্যাবস্থা করা হয়ে থাকে।
ঐ সময়ে আমরা গোয়াতে থাকাকালীন আমরা মিঃ জেভিয়ার্সের মমি দর্শনের সুযোগ পেয়ে ছিলাম।মিঃ জেভিয়ার্স ইংরাজ রাজত্বকালে অশিক্ষিত এবং গরিব বাঙালিদের শিক্ষার প্রসারের জন্য তার অবদান অনস্বীকার্য।
তার নামে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ আছে এবং বর্তমানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি মর্যাদা লাভ করেছে। গোয়াতে থাকাকালীন গোয়ার বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান, উত্সবের আমেজর সাথে গোয়ার বিখ্যাত লোকনৃত্য দেখার সুযোগ পরিপূর্নরূপে উপভোগ করতাম।
ছুটির দিন গুলো তে সময় ও সুযোগ অনুযায়ী সঙ্গী সাথীর সাথে গোয়ার দর্শনীয় স্থান যেমন বেসিলিকা অফ বোম জেসাস চার্চ, অঞ্জুনা সী বিচ, পালোলেম সী বীচ, আগোন্ডা সী বীচ, কাভেলোসিম সী বীচ, কালানগুটে বিচ,মরজিম বিচ, কোলভা বিচ, বাগা সী বিচ, দমন, দিউ, ইত্যাদি স্থানে ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম।
আট মাস পর গোয়ার কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলাম।
কলকাতায় ফিরে এক সপ্তাহ পর আবার আমাকে কর্নাটকের হুবলীর নিকটবর্তী ধারোয়ার শহরের আর এস বি গ্লোবাল কোম্পানিতে অ্যামেরিকান কোম্পানির ক্যাটারপিলারের প্রোজেক্টের ডিজাইনে পে লোডার ইনসপেক্সানের কাজের জন্য ৩ বছরের জন্য ডেপুটেশনে পোস্টিং করা হয়েছিল।
ছুটির দিন গুলো তে সুযোগ ও সময় অনুযায়ী সঙ্গী সাথীর সংগে হুবলী এবং ধারোয়ারের দর্শনীয় স্থান যেমন শ্রীসিদ্ধারুধা স্বামী মঠ, উনাকল লেক, ন্রুপাটুঙ্গাবেট্টা, ইসকন শ্রীকৃষ্ণ বলরাম মন্দির, চন্দ্রমুলেশ্বর মন্দির, হাম্পী এবং আনসী ন্যাশানাল পার্ক প্রভৃতি স্থান ঘুরে ধারোয়ারের কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলাম।
এই ভাবেই আমার কর্মজীবনের চাকা গড়াতে লাগলো।
"আমার কোম্পানির কাজের প্রয়োজনে বিবাহের পূর্বে এবং বিবাহের পরবর্তীকালে আমাকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে ঘুরে কাজ করার প্রয়োজন হতো।
আমার সার্ভিস লাইফস্টাইলকে আমার প্রতি ভগবানের বরদান হিসাবে আমি কর্মজীবনের সাথে আমার লাইফস্টাইলকে মিশিয়ে ভারত ভ্রমণের সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিলাম।"
১৯৯১ থেকে ২০১০ অবধি এই সুদীর্ঘ উনিশ বছর ও কোম্পানির প্রয়োজনে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে যাতায়াত করার এবং কাজকর্ম করার সুযোগের সদ্ব্যবহার করি। কোম্পানির আর্থিক ও ব্যবসায়ীক পরিস্থিতি ১৯৯১ তে যে চারা গাছ অবস্থা থেকে কতিপয় পারিশ্রমিক ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা ২০১০ সালে বিরাট বটবৃক্ষে পরিনত লাভ করে।
কিন্তু কোম্পানির পরিচালন কমিটির কতিপয় স্বার্থান্বেসী পরিচালন কমিটির সদস্যদের ব্যর্থতায় ঐ মহারূহ বটবৃক্ষের পতন ২০০৯ সাল থেকেই আরম্ভ হয়ে যায় এবং কোম্পানির প্রথম কতিপয় ইঞ্জিনিয়ারদের (যাদের অমানুষিক প্ররিশ্রম ও প্রথম দিকে অর্থ সাহায্য ছাড়া কোম্পানির ব্যবসায়ীক অগ্রগতি ও উন্নতি সম্ভব ছিল না) কোম্পানি ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।
এই শেষ বয়সে আমাদের দুর্ভাগ্য সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হয়ে যায় । ২০১০ থেকে ২০২০ (কোভিড শুরু হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পয্যন্ত) এই সুদীর্ঘ দশ বছর সময় কোনো অন্যায় বা ভুল বা অন্যায় কাজ না করে ও আমার জীবনের সবচেয়ে কালো দিনের বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হতে হয় এবং সুমধুর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে বাধ্য হই এবং খড়কুটোর মত জলে ভেসে থাকার পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় ।
পরবর্তীকালে ধীরে ধীরে অ্যাকুট হার্টের পেসেন্ট পরিনত হয়ে অচল পয়সায় পরিনত হই, যার জীবনের বর্তমান বাজার মূল্য মাত্র ডবল জিরো।
এই আমার সুদীর্ঘ পঁয়ষট্টি বছর বয়সের ছোট্ট বড় , সুখ দুঃখের অভিজ্ঞতার অপ্রয়োজনীয় গল্প, দলিল দস্তাবেজ বা ইতিহাস।
আমার প্রিয় পাঠকগনদের ইচ্ছানুসারে শ্রীমান কেল্টু কুমারের জীবন পঞ্জিকা আজ পাঠকসমাজের সামনে উপস্থিত করা হল।
নমস্কারান্তে ।।।।
কেল্টো মহাশয়।
তাং - ..............
পরিসমাপ্ত।
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
Comments
Post a Comment