৵ সুন্দরবনের বিভিষীকা 'কু', পুনঃ প্রচারিত পর্ব ।
শ্রীযুক্ত কালীচরন মুখোপাধ্যায় মহাশয় সকাল থেকেই ঝড় বৃষ্টির কারণে ঘরে বন্দী হয়ে আছেন, এই বৃষ্টি বাদলের দিনে তার শৈশবের এক বাল্য বন্ধু কেশবের কাছ থেকে শোনা সুন্দরবনের এক বৈচিত্র্য ময় গা ছম ছম করা এক কাহিনীর রস্বাসদন করতে মশগুল হয়ে উঠলেন।
তাই আজকে তার স্মৃতিচারণ বিষয় : - ‘কু’, পর্ব- ২৭R1 , পুনঃ প্রচারিত।
নেহাত আপনি উপর মহলের সুপারিশ নিয়ে এসেছেন, নাহলে পারমিশন দেওয়া সম্ভব ছিল না। ওইসব রিস্ক কী নেওয়া যায় বলুন তো! তবে গার্ড একজন কিন্তু নিতেই হবে।” কিছুটা অনিচ্ছুক ভাবে সই করতে করতে কথাটা বললেন রেঞ্জার। “হ্যাঁ মানে খুব প্রয়োজন তাই আর কী, বোঝেনই তো। নাহলে আমি কী সাধে যাচ্ছি। আর গার্ড তো একজন যাবেই” কথাটা বললাম ঠিকই কিন্তু আমিই জানি যে যাওয়ার পেছনে সাধ আসলে কতটা!
“আপনি জেটি ঘাটে চলে যান, গার্ড ওখানেই থাকবে। আর আপনি ফিরে এসে কিন্তু আগেই অফিসে রিপোর্ট করবেন। বুঝেছেন? “ একটু রুক্ষ গলায় বললেন রেঞ্জার ভদ্রলোক। “হ্যাঁ হ্যাঁ সে তো নিশ্চয়ই।” ফাইলটা নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এলাম।
জেটি ঘাটের কাছে এসে দেখি, পিঠে বন্দুক নিয়ে অল্পবয়স্ক একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে এগিয়ে এসে বলল, “আমি রবি স্যার, ফরেস্ট গার্ড। আমাকেই বলেছে আপনার সাথে যেতে।”
আমি অল্প হেসে বললাম, “চলো তাহলে যাওয়া যাক।”
আসার আগে যোগাযোগ করে রেখেছিলাম নৌকার জন্য, যাতে এসে খোঁজাখুঁজির ঝামেলা না পোহাতে হয়। জেটি ঘাটে এসে দেখলাম, ফোনে বলে দেওয়া জায়গায় একটা মাঝারি মাপের নৌকা নোঙর করা। আমাকে আসতে দেখে একজন মাঝবয়সী লোক হাত নেড়ে ইশারা করল। আমি আর রবি নৌকার দিকে এগিয়ে গেলাম।
“নমস্কার স্যার! এই যে নৌকা।”
আমি নৌকাটা একবার ভালো করে দেখলাম। মাঝারি মাপের ছই দেওয়া ওপরে। নৌকার পেছন দিকটায় মোটর লাগানো।
“তা ইয়ে, শক্তপোক্ত তো? ডুবে যাবে না?” একটু সন্দেহের গলায়ই প্রশ্ন করলাম।
“ হেঁ হেঁ কী যে বলেন স্যার! কম দিন হলো এই বাদাবনে! একদিনের জন্যও পবলেম হয়নি।” লোকটা একগাল হেসে উত্তর দিল।
“ঠিক আছে চলো তবে। এসো রবি।”
আমরা সবাই নৌকায় উঠে পড়লাম। মাঝবয়েসী মাঝি মোটর চালু করে দিল। আর একজন অল্প বয়েসী ছেলে হাল ধরে বসল। জেটি ছেড়ে নৌকা এগোতে লাগল নদী ধরে।
“আপনার নাম কী দাদা?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“আমার নাম রফিক স্যার। আর ও ফটিক, আমার গ্রামেরই ছেলে।” অল্প বয়সী ছেলেটিকে দেখিয়ে বলল রফিক।
আমি একজন ফোটোগ্রাফার। সুন্দরবনে ফোটোগ্রাফার হিসেবে আমার এই প্রথমে আসা। আগে এসেছি, কিন্তু কলেজে পড়াকালীন। তখনের সাথে এবারের তাই পার্থক্য অনেক। এবারে এসেছি একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে।
সুন্দরবনের অনেক বিরল প্রজাতির মধ্যে অন্যতম প্রজাতি বাফি ফিস্ আউল।খুব কম সংখ্যক ফটোগ্রাফারই পেরেছে এই দুর্লভ পাখিটির ছবি তুলতে। আমার এই বার সুন্দরবনে আসার কারণ এই বিশেষ পেঁচার ছবি তুলতে। আর তাঁর জন্যই সোনাখালী থেকে পারমিট করিয়ে রওনা দিয়েছি রফিকের নৌকায়।
“ইয়ে স্যার বলছিলাম মানে আপনি কী সত্যিই চামটার কাছে যাবেন?” প্রশ্ন করল রফিক।
“তাছাড়া কী আর পাওয়ার আশা আছে? আর সাথে তো বন্দুক আছেই।” হালকা গলায় উত্তর দিলাম।
“স্যার, আমাকে কিন্তু চামটা অবধি যাওয়ার কথা বলা হয়নি। আপনার কী পারমিট আছে অত অবধি?” সতর্ক গলায় রবি জিজ্ঞেস করল আমাকে। “আরে না না!” আমি ওঁকে আশ্বস্ত করি। “আমি ছবি পেয়ে গেলে অত দূর যাব কেন!”
যারা সুন্দরবন বেড়াতে যান, তাঁরা যেটাকে সুন্দরবন বলে জানেন সেটা আদতে সজনেখালি ঘেঁষা কয়েকটা দ্বীপ। সেই অর্থে সুন্দরবনই নয়। তাই আমি খুব ভালো করে জানতাম লোকবসতির এত কাছাকাছি কিছুতেই আমি পেঁচার ছবি পাবো না। আর তাই সিদ্ধান্ত নিই কোর এরিয়াতে ঢোকবার। কলকাতায় অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পরিচিত এক সূত্র থেকে সুপারিশ জোগাড় করি। যার দৌলতে পারমিট করিয়ে নৌকা নিয়ে যাচ্ছি চামটার দিকে।
চামটা সুন্দরবনের কোর এরিয়ার দ্বীপ এবং বাদাবনের তামাম বাঘের আড্ডা। তাই রফিক আরও দু বার প্রশ্ন করে ফেলল যে চামটার কাছে কী সত্যি সত্যি যেতে হবে। আমি ওঁদের এখনও অবধি নানারকম প্রবোধ দিয়ে রেখেছি যে দ্বীপের কাছাকাছি যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।
(২)
জল কেটে ভটভট শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে নৌকা। হাতঘড়িতে দেখলাম দুপুর ১২টা। পিছন ফিরে জিগ্যেস করলাম “কতক্ষণ আরও?”
“এই তো স্যার ডানদিকে পঞ্চমুখানির জঙ্গল শেষ হলে নদীর মুখে গিয়ে পড়ব সেখান থেকে আবার ডানদিক ধরে এগোতে হবে। নদীর মুখ থেকে ঘন্টা দেড়েক আরও।”
“অতক্ষণ!!” কিছুটা অবাক হয়েই প্রশ্ন করলাম।
“হ্যাঁ স্যার ওখান থেকে আমরা মোটর বন্ধ করে দেব। জায়গাটা ভালো নয়, যতটা শব্দ কম করা যায়।”
বুঝলাম বাদাবনের আসল রাজ্য শুরু হচ্ছে। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। নদীর ধার দিয়ে দিয়ে জেগে আছে ম্যানগ্রোভের জঙ্গল। গরান, গেঁওয়া, গোলপাতার জঙ্গল নদীর ধার ঘেঁষে এগোচ্ছে সাথে সাথে। এই কটা গাছ মোটামুটি চিনতে পারলাম। বেশ কিছু গাছ একদম ঝুঁকে পড়েছে নদীর গায়ে। ঝুঁকে পড়া ডালে মৌনীবাবার মত বসে আছে কয়েকটা কোঁচবক। ক্যামেরা চালানোর সুযোগটা হাত ছাড়া করলাম না। একসময় ডানদিকের জঙ্গল শেষ হল।
নদীটা এসে দু ভাগে ভাগ হয়ে গেছে একটা চওড়া মুখের কাছে। ডানদিকে বাঁক নিল আমাদের নৌকা। “এই বাঁ দিকের নদীটা কোনদিকে গেছে?” জিগ্যেস করলাম রবি কে।
“এটা হরিণভাঙা নদী স্যার। চাঁদখালির জঙ্গল ধরে আরও এগিয়ে এটা সোজা বাংলাদেশের কাছে চলে গেছে।”
“ওই যে দূরের জঙ্গলটা দেখছেন? ওটাই চামটা দ্বীপ।” রফিক আঙুল তুলে দেখাল।
“এদিকে আর কোন নৌকা তো দেখছি না?” কৌতূহল বশে জিজ্ঞেস করলাম।
“কোর এরিয়া শুরু হয়ে গেছে স্যার। এদিকটা মাছ ধরা, জঙ্গলে ঢোকা বারণ।” উত্তর দিল রবি।
“কিছু কিছু লুকিয়ে চুরিয়ে তবু আসে। জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে থাকে সুযোগ মত মাছ কাঁকড়া ধরে।” বলল রফিক।
নৌকা আরও কিছুটা এগোনোর পর একটা বাঁক নিল। দু ধারে শুরু হল আরও ঘন জঙ্গল । এখন ভাঁটার সময়। জলের ধারে ধারে চর জেগে উঠেছে, কাদামাটির চর। গোটা চর ধরেই জেগে আছে পেরেকের মত ঘন শ্বাসমূল। খুব অভ্যাস না থাকলে এই শ্বাসমূলের ভেতর দিয়ে এক পাও হাঁটা যায় না। একটু এদিক ওদিক হলেই রক্তারক্তি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। বাঁক নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রফিকরা মোটর বন্ধ করে দিয়েছে। নিশ্চুপ ভাবে দাঁড় বেয়ে চলছে নদী ধরে। “বাঘমামা দেখার চান্স আছে নাকী রফিক?” একটু মজা করেই জিজ্ঞেস করলাম।
রফিক নিমেষের মধ্যে আতঙ্কিত গলায় বলল, “চুপ করেন স্যার। একদম নাম নেবেন না। ও নাম নেওয়া বারণ।”
রবি ফিসফিস করে আমার কানের কাছে এসে বলল, “ওঁরা কেউ কখনও বাঘ দেখতে চায় না। আপনারা বাঘ দেখতে পেলে আনন্দ পান কিন্তু ওঁদের কাছে তা মৃত্যুর কারণ। বাদাবনের প্রবাদ আছে স্যার, বড়মিঞার সাথে চোখাচোখি হলে সে আর বাঁচে না”
আমি স্বভাবতই একটু ঘাবড়ে গেলাম। নৌকার ধার থেকে মাঝামাঝি গিয়ে বসলাম। রফিক একসময় দাঁড় টানা বন্ধ করে দিয়ে সন্দিগ্ধ চোখে সামনের দিকে দেখতে লাগল।
আমি একটু উঁকি মেরে দেখলাম, চামটার দ্বীপ আরও কাছে এসে গেছে আর তাঁর আগে মূল নদী থেকে কয়েকটা খাঁড়ি দু দিকেই বেঁকে গেছে। বুঝলাম রফিক কোন খাঁড়ির কাছে গিয়ে নোঙর করবে। আবার ঘড়ি দেখলাম, ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৩টে ছুঁইছুঁই। খুব বেশী হলে ওঁরা একঘন্টা অপেক্ষা করবে। কিন্তু তারপর? আমি প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি, দরকার পড়লে ও পথেই যাব৷ ছবি আমার চাইই।
রফিক আবার দাঁড় টানা শুরু করল। রবিকেও দেখলাম চোখ মুখ খুব সতর্ক। কিছুটা এগোনোর পর বাঁ দিকে একটা খাঁড়ির মুখে এসে নৌকা নোঙর করল। ফটিক নৌকার পেছনদিকে মুখ করে, আর রফিক সামনের দিকে মুখ করে বসল। বুঝলাম যাতে কোনদিক থেকে বিপদ এলে সেটা বোঝা যায় তাই এই ব্যাবস্থা। নৌকার খোলের ভেতর থেকে একটা ধারালো দা বের করে ফটিক হাতে রাখল।
আমার কেমন গলাটা শুকিয়ে এলো। এতটা বিপদের আশঙ্কা আছে বুঝতে পারিনি সত্যি। কিন্তু এসেছি যখন কাজ হাসিল করেই যাব।
“জায়গাটা সুবিধের নয়। কাদামাটিতে দেখুন কেমন ঘষা ঘষা দাগ। বড় কুমির আছে আশেপাশেই।” চাপা গলায় বলল রফিক।
জঙ্গলের ভেতর ঝুপসি অন্ধকার, কিছুই বোঝা যায় না। কেমন একটা গা ছমছমে নিস্তব্ধতা। গা টা শিরশির করে উঠল। আমি ক্যামেরাটা তৈরী করে রাখলাম।
সময় কাটতে লাগল। জলের আওয়াজ আর মাঝে মাঝে পাখির ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। ওঁরা দেখলাম অধৈর্য হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। আমি প্রমাদ গুনলাম।
“আর একটু এগোনো যায় না?” খুব সাবধানে প্রশ্ন করলাম।
“না স্যার। আর এগোনো যাবে না।” রবি উত্তর দিল।
“অনেক্ষণ এক ভাবে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। জানি না স্যার ওদিকের জঙ্গল থেকে আমাদের কেউ দেখছে নাকি!” মাপ করেন স্যার। এবার ফিরব, নাহলে সন্ধের মধ্যে নেতিধোপানিও পৌঁছাতে পারব না।” নোঙর তুলতে তুলতে বলল রফিক।
আমি ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা নোটের বান্ডিল বের করে আনলাম। বললাম, “ এতে পাঁচ হাজার আছে। আমি পাওনার থেকে আরও বেশীই দিচ্ছি, আর আধটা ঘন্টা একটু এগিয়ে চলো। প্লিজ!
“স্যার কিন্তু..” আমি রবিকে থামিয়ে দিলাম। বললাম, “কেউ তো জানবে না রবি। তুমি না বললে ফরেস্টে অফিসের কেউই জানবে না।”
রফিক বলল, “শুধু আধঘন্টা স্যার। তারপর মোটর চালিয়ে বেড়িয়ে যাব।”
ফটিক নোঙর তুলে ফেলল। জলে আবার ছপছপ শব্দ উঠল। দূরের চামটার কালো জঙ্গল একটু একটু করে দেখলাম এগিয়ে আসছে।
আরও কিছুটা এগোনোর পর, দ্বীপের কাছাকাছি আরও একটা খাঁড়ির মুখে নৌকা নোঙর করা হল। আগের মতই সমস্ত সতর্কতা নিয়েই ওঁরা বসল। আমি ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে কান খাড়া করে রইলাম যদি ডাক শোনা যায়। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে লাগল। নভেম্বর মাস, বেলা মরে এসেছে প্রায়।
নাহ্! পাওয়া যাবে না মনে হয়, মনে মনে ভাবলাম। টাকা জমিয়ে সামনের মাসে আবার একবার চেষ্টা করব। রফিক আমার দিকে তাকিয়ে আাছে, শুধু ইশারার অপেক্ষায়। আমি রাজী হলেই ও ফেরার পথ ধরবে। আমিও রফিককে বলতে যাবো হঠাৎই—
খাঁড়ির ভেতর থেকে একটা তীক্ষ্ণ চেরা গলায় অস্পষ্ট ডাক শুনলাম। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এ ডাক আমি চিনি। আসার আগে ইন্টারনেটে বহুবার শুনেছি। যদি এই অবস্থায় ছবি ও ডাক নিতে পারি সেটা হবে ভারতবর্ষের প্রথম রেকর্ড। আমি রফিককে আওয়াজ করে বললাম, “শিগ্গিরই রফিক! ভেতরে চলো!”
রবি আমার হাত ধরে টেনে বসিয়ে বলল, “আপনি চুপ করে বসুন।” তারপর রফিকের দিকে ইশারা করল। খুব অনিচ্ছুক ভাবে রফিক খাঁড়ির ভেতর নৌকা ঢোকাল। কিছুটা দূরে নৌকা বাওয়ার পর রফিককে হাত দিয়ে থামতে বললাম। দাঁড়ের ছপছপ শব্দ বন্ধ হতেই খাঁড়ি ও সংলগ্ন জঙ্গল আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আর ঠিক তখনই কাছেই একটা ঝুঁকে পড়া ডালের ভেতর থেকে আবার সেই তীক্ষ্ণ চেরা ডাকটা নিস্তব্ধতা খান খান করে দিল। রফিক নৌকা ঠেলে এগিয়ে গেল গাছের ডালটার কাছে। দেখলাম একটু উপরে প্রায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে আমার অভীষ্ট লক্ষ্যকে। দেরী করলাম না, ক্যামেরা তুলে পটাপট ছবি নিতে লাগলাম। ছবি নেওয়া শেষ হতেই রফিক কোন কথা না বলে ফটিক কে নৌকা ঘোরাতে বলল। খাঁড়ির মুখে আসতেই রফিক মোটর স্টার্ট করে দিল। গর্জন করে উঠল মোটর। সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে।
(৩)
ফিরতে ফিরতে রফিককে জিজ্ঞেস করলাম “ তুমি ফটিককে কু বলে ডাকলে কেন?”
রফিক উত্তর দিল, “ জঙ্গলের নিয়ম। বাদার ভেতর ঢুকলে কেউ কাউকে নাম ধরে ডাকে না। মউলেরা বা বাউলেরা এটা বেশী মানে। নাম ধরে ডাকলে বড়মিঞা তাঁকে চিনে রাখে। সবাই কে ছেড়ে তাঁকেই ধরে। তাই কু ডেকেই নিজেদের খবর চালাচালি হয়”
“মাথার পেছনে মুখোশ বেঁধে ঢোকার নিয়ম হয়েছিল না? তারপরও ধরে?” জিজ্ঞেস করলাম।
“বাদাবনের বাঘ আমাদের ওপর দিয়ে যায় স্যার। খুব অল্প দিনেই ওরা বুঝে গেছে ওটা নকল। ওই দিয়ে আর আটকানো যায় না এখন।” এবার রবি উত্তর দিল।
“ওই যে হলদে হলদে ঝোপগুলো দেখছেন? ওগুলো হেঁতালের ঝোপ। ওর ভেতর লুকিয়েই বড়মিঞা শিকারের ওপর নজর রাখে। ” রফিক দেখাতে দেখাতে বলল।
তাকিয়ে দেখলাম, নদী থেকে খুব দূরে নয়, সুন্দরবনের বাঘ শুনেছি বিরাট লাফ দিতে পারে। ভালোয় ভালোয় নেতিধোপানি পৌঁছাতে পারলে হয়।
হঠাৎই বিশ্রী একটা শব্দ করে মোটরটা বন্ধ হয়ে গেল। রফিক তাড়াতাড়ি করে আবার চালু করতে গেল কিন্তু একটা খ্যারখ্যার করে মোটরটা একদম চুপ মেরে গেল। “এই কী হল! রফিকদা দেখো আবার!” রবির গলায় স্পষ্টতই আতঙ্কের ছোঁয়া। রফিক আরও বারতিনেক চেষ্টা করে বলল, “মনে হয় বসে গেছে। কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করছি।”
“ততক্ষণ কী এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব নাকি!!” আমি আতঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“না না! আমরা দাঁড় টানতে শুরু করছি। দুজনে টেনে যতটা এগিয়ে যাওয়া যায়। সামনে খাঁড়ির ভেতর ঢুকে গেলে তাড়াতাড়ি হবে।”
“ওই জঙ্গলে কী বলে, ইয়ে বড়মিঞা নেই?” জিজ্ঞেস করলাম।
“আছে! কিন্তু উপায় নেই। এখানে থাকা যাবে না। আর বড় নদীর ওপর দিয়ে সূর্য ডোবার পর গেলে ডাকাতের হাতে পড়ার ভয় আছে।” রফিক বলল। “ডাকাত!” এটাও বাকী ছিল তাহলে। “হ্যাঁ স্যার! বাঘের থেকে কম না ডাকাতের ভয়। আর সাথে টাকা, ক্যামেরা আছে। ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।”
আমি অগত্যা ওঁদের পক্ষেই মত দিলাম। অবশ্য উপায়ও নেই কিছু।
জলে ছপছপ শব্দে দাঁড় ফেলে নৌকা আবার এগোতে লাগল। জঙ্গলের কোণায় কোণায় তখন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে।
কিছুটা গিয়ে একটা মোটামুটি চওড়া খাঁড়ির ভেতর ঢুকে পড়লাম। খাঁড়িটা চওড়া হলেও চরের গাছগুলো জলের ধারে ধারে ঝুঁকে এসেছে। আর খুব আবছা আলো যতটুকু বাকী ছিল, তাতে দেখলাম চরের গায়ে গায়ে হেঁতালের ঝোপ জেগে আছে।
আমি ছইয়ের ভেতর ঢুকে বসলাম। ক্যামেরার ব্যাগটা দু হাতে জড়িয়ে রাখলাম বুকের কাছে। ভালোয় ভালোয় ফিরতে পারলে হয়। যদিও একটা বন্দুক আছে, কিন্তু ওই আদ্যিকালের অস্ত্র থাকাও যা না থাকাও তা। খাঁড়ির ভেতর জমাট বেঁধে আছে অন্ধকার। মাঝে মাঝে কয়েকটা রাতচরা পাখির ডাক আর খুব সাবধানী দাঁড়ের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। নৌকাটা বোধহয় বাঁ দিকে একবার ঘুরল। আমি ব্যাগটা ভেতরে রেখে, বাইরে এসে রবির পাশে বসলাম। রবি খুব সজাগ ভাবে দু ধারের জঙ্গল দেখতে দেখতে বারবার ঘাড় ঘোরাচ্ছে । একটা আবছা জলে কিছু পড়ার শব্দ পেলাম। রবি ফিসফিস করে বলল, “কুমির”
কেমন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। বুঝতে পারছি না ঠিক, কিন্তু কোথাও যেন কিছু একটা ঠিক নেই। গা-টা অকারণেই একবার ছমছম করে উঠল। রফিককে ডাকতে যাব তখনই—
বাঁদিকের কালো জঙ্গল ভেদ করে শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে দিল গা ছমছমে একটা কু ডাক। আমি চীৎকার করে রফিককে কিছু বলতে যাব, রবি সজোরে আমার হাতটা চেপে ধরে চুপ করতে বলল। দেখলাম ভয়ে ওঁর মুখটা সাদা হয়ে গেছে । রফিক আর ফটিক প্রাণপণে দাঁড় টানছে। শব্দটা আর শুনতে পেলাম না। কিছুটা এগিয়ে এসেছি, আবার সেই বাঁ দিকের জঙ্গল থেকে গা ছমছমে কু ডাক। বুঝলাম ঘন জঙ্গলের আড়াল থেকে নৌকার সাথে সাথেই কেউ যাচ্ছে। কে সে! এতরাত্রে এই ভয়ংকর বনের মধ্যে কী কেউ আটকে পড়েছে।
নৌকার মাঝিরা কিন্তু সর্বশক্তি দিয়ে এগিয়ে যেতে চাইছে এই জায়গাটা থেকে দূরে। আর তখনই জঙ্গলের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে একটা অমানুষিক চীৎকার ভেসে এল। “আঁ…হুঁ..হুঁ….আঁ….উঁ…হুঁ…..আঁ…মঁ…হুঁ….আঁ” চীৎকারের প্রতিটা স্বর বুঝিয়ে দিচ্ছে এ কোন মানুষের চীৎকার নয়। রবি আমার হাত ধরে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। মাঝি দুজন দাঁড় ফেলে দিয়ে নৌকার খোলের ওপর উপুড় হয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমি বুঝতে পারছি না যে আমি কী জীবিত পৃথিবীর কোথাও আছি!
সেই অমানুষিক চীৎকার যেমন হঠাৎ শুরু হয়েছিল তেমন হঠাৎই বন্ধ হয়ে গেল। আর তার সাথে সাথেই গোটা বনভূমি জুড়ে নেমে এল এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা। রবি গিয়ে রফিক আর ফটিক কে ধাক্কা দিয়ে তুলল। দেখলাম স্রোতের টানে আমরা কিছুটা দূর এগিয়ে এসেছি। ওঁরা আর একটাও কথা না বলে জোরে জোরে দাঁড় টানতে লাগল। আমি ছইয়ের ভেতর ঢুকে পড়লাম। কিছুটা এগোনোর পর খাঁড়িটা শেষ হয়ে এল। আবার বড় নদীতে এসে পড়লাম। রফিক কী মনে হত মোটরটা চালু করতে গেল আরেকবার। আশ্চর্যজনক ভাবে মোটরটা আওয়াজ করে উঠল। রফিক যেন একটু অদ্ভুত ভাবে হাসল।
নেতিধোপানির ঘাটে যখন নামলাম তখন প্রায় মাঝরাত। বাকী রাস্তা আর কোন সমস্যা হয়নি। নৌকা বেঁধে রফিক বলল, “চলেন, আজকের রাতটা আপনার সাথে আমরাও ফরেস্টের অফিসঘরে থেকে যাব। অফিসে এসে রিপোর্ট করলাম। বললাম মোটর খারাপ হওয়াতে এই দেরী। বাকী সব কিছু মিটিয়ে এসে বসলাম বাইরের বেঞ্চে। রফিক একটা বিড়ি ধরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, আমাকে দেখে অল্প হাসল।
“ওটা কী ছিল রফিক?” নীচু গলায় প্রশ্ন করলাম।
“ওটা বেঘোর ডাক স্যার!”
“বেঘো মানে?”
“বেঘো এক ধরণের অপদেবতা স্যার। বড়মিঞা যাঁদের জঙ্গলের ভেতর টেনে নিয়ে যায়, সেই লাশগুলো আর পাওয়া যায় না। কোন সৎকার হয়না তাঁদের, না আগুন পায়, না গোরের মাটি। তাঁরাই বেঘো হয়ে ঘুরে বেড়ায় বাদাবনের অন্ধকারে।”
“কিন্তু ওই কু ডাক?” জিজ্ঞেস করলাম।
“ওটাই বেঘোর ডাক স্যার। যেমন মউলে আর বাউলেরা ডাকে। খালি ওঁরা মধু আনতে বা কাঠ কাটতে দিনের আলোয় যায়, তাই দিনে ডাকে। আর বেঘো ডাকে রাতে। কেউ কেউ বলে ওঁরা ডেকে নিয়ে যেতে চায় নিজেদের আধখাওয়া লাশটার যদি কোনো সৎকার হয়। কেউ বলে বেগো ডাকে নিজের মত অন্য কারোর পরিণতি হওয়ার জন্য। কিন্তু আজ অবধি বেঘোর ডাক শুনে কেউ জঙ্গলে ঢুকে আর ফিরে আসেনি।”
“তুমি শুনেছিলে এর আগে কখনও?”
“না স্যার। আমি রাতের বেলা কখনও জঙ্গলে এর আগে থাকিনি। কিন্তু অনেকেই শুনেছে। যারা রাতের বেলা নৌকায় থাকে তাঁরা শোনে। অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর কেউ কু ডাকছে। ওই জঙ্গলের কাছেই কদিন আগে বড়মিঞায় মানুষ নিয়েছে, মোটর খারাপ এমনি এমনি হয় নাই স্যার। আমাদের কেই ও ডাকছিল।”
একটানা কথা বলার পর রফিক থামল। চুপ করে আবার বিড়ি টানতে লাগল।
আমিও আর কথা বাড়ালাম না। কাল সকালেই আমি কলকাতা ফিরে যাব। আস্তে আস্তে ভুলেও যাব এসব কিছু। ভাববো একটা দুঃস্বপ্ন ছিল বোধহয়। কিন্তু ওই রক্তজল করা কু ডাক! ভুলতে পারবো? কেউ কী বিশ্বাস করবে কোনদিন?
সুন্দরবনে জঙ্গল নিয়ে অনেক কুসংস্কার আছে, তার মধ্যে একটা হলো 'বেঘোর' ডাক, যাদের বাঘে টেনে নিয়ে যায়, তাদের কোনো সৎকার বা কবর হয় না। তারা নাকি অপদেবতা হয়ে যায়। গভীর জঙ্গলে কেউ গেলে রাতের দিকে 'বেঘোর' ডাক শোনা যায়। তারা নাকি ডাকে সবাইকে, ওর পচে গলে যাওয়া শরীরটা তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
জঙ্গলের লোকেরা এই ডাক কে 'কু' ডাক বলে।
প্রচন্ড ভয় পায়। সেই ডাক নাকি এতো ভয়ংকর যে শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে দেয়। গভীর কালো জঙ্গল থেকে কেউ আপনাকে ডাকছে ! যার কোনো শরীর নেই,অস্তিত্ব নেই, এটা একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। আমি এই ডাক শুনি নি। এইগুলো
কুসংস্কার বটেই কিন্তু আপনি যদি ওই পরিস্হিতি
তে পড়েন, আপনার সব নিয়ম মানতে ইচ্ছে করবে। সুন্দরবন মানে সজনেখালীর আশপাশের জঙ্গল নয়, আর স্টিমার থেকে দেখা নয়। কিন্তু কেউ অনুপ্রাণিত হয়ে যেতে যাবেন না, এখন অনেক বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। প্রবাদ আছে, বাঘের সঙ্গে চোখাচুখি হলে সে আর ফেরে না।
(সংগৃহীত এবং পরিমার্জিত।)
নমস্কারান্তে ।।।।
কেল্টো মহাশয়।
তাং - ..............
পরিসমাপ্ত।
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
Comments
Post a Comment